Saturday, March 2, 2013

আমি তাওবা করতে চাই কিন্তু! পর্ব-৩ – তাওবার শর্ত ও এর পরিপূরক বিষয়

শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু

তাওবা শব্দটি এক মহান শব্দ। এর অর্থ খুবই গভীর। এমন নয় যা অনেকেই মনে করে থাকেন, মুখে শব্দটি বললাম অতঃপর গুনাহে লিপ্ত থাকলাম। আপনি আল্লাহর নিম্নোক্ত বাণী অনুধাবন করে দেখুন। আল্লাহ্ কি বলছেন:

“তোমরা তোমাদের প্রভূর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। অতঃপর তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন (তাওবা) কর।” (সূরা হুদ: ৩)
আয়াতের মধ্যে সকলকে ক্ষমা চাইতে বলা হয়েছে, অতঃপর তাওবা করতে বলা হয়েছে। সুতরাং তাওবা হচ্ছে ক্ষমা প্রার্থনার পর অতিরিক্ত আলাদা বিষয়।
কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের জন্য অবশ্যই কিছু শর্ত থাকে। আলেম-ওলামাগণ কুরআন ও হাদীস মন্থন করে তাওবার জন্য কতিপয় শর্ত উল্লেখ করেছেন, তা হলো:

এক: দ্রুত পাপ থেকে বিরত হওয়া।

দুই: পূর্বে যা ঘটে গেছে সে জন্য অনুতপ্ত হওয়া।

তিন: পুনরায় পাপ কাজে ফিরে না আসার জন্য দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করা।

চার: প্রাপকদের হক ফিরিয়ে দেয়া যা অন্যায়ভাবে নেয়া হয়েছিল অথবা তাদের নিকট থেকে মাফ চেয়ে নেওয়া।
আর খালেসভাবে তাওবার জন্য কতিপয় আলেম যেসব শর্ত উল্লেখ করেছেন, নিম্নে সেগুলো উদাহরণসহ আলোচনা করা হচ্ছে।

[এক]: শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য পাপ ত্যাগ করা, অন্য কোন কারণে নয়, যেমন;
অক্ষমতার কারণে পাপ থেকে দূরে থাকা, এসব কর্ম করতে ভাল না লাগা অথবা লোকজন মন্দ বলবে এই ভয়ে পাপ ত্যাগ করা।
এজন্য তাকে তাওবাকারী বলা হবে না, যে ব্যক্তি পাপ ত্যাগ করেছে তার মানহানী ঘটায় বা এর জন্য হয়তো সে চাকুরীচ্যুত বা পদবী হারাতে পারে।
তাকে তাওবাকারী বলা যাবে না, যে ব্যক্তি পাপ ত্যাগ করল তার শক্তি ও স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য। যেমন; কেউ জেনা করা ত্যাগ করলো যেন দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে বাঁচতে পারে অথবা তার শরীর ও স্মৃতি শক্তিকে দুর্বল না করে।

তেমনিভাবে তাকে তাওবাকারী বলা যাবে না, যে ব্যক্তি চুরি করা ছেড়ে দিয়েছে; কোন বাড়ীতে ঢুকার পথ না পেয়ে বা সিন্দুক খুলতে অসমর্থ কিংবা পাহারাদার ও পুলিশের ভয়ে।
তাকে তাওবাকারী বলা যাবে না, যে দূর্নীতি দমন বিভাগের লোকজনদের জোর তৎপরতায় ধরা পড়ার ভয়ে ঘুষ খাওয়া বন্দ রেখেছে।

আর তাকেও তাওবাকারী বলা যাবে না, যে ব্যক্তি মদ পান, মাদকদ্রব্য বা হেরোইন সেবন ইত্যাদি ছেড়ে দিয়েছে দারিদ্রের কারণে।
তেমনিভাবে তাকেও তাওবাকারী বলা যাবে না, যে সামর্থহীন হওয়ার কারণে গুনাহ করা ছেড়ে দিলো। যেমন মিথ্যা বলা ছেড়ে দিয়েছে তার কথায় জড়তা সৃষ্টি হওয়ার কারণে কিংবা জেনা করছে না যেহেতু সে সহবাস ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে, কিংবা চুরি করা ছেড়ে দিয়েছে আহত হয়ে পঙ্গু হয়ে পড়ার কারণে।
বরং এসবে অবশ্যই অনুতপ্ত হতে হবে, সব ধরনের পাপ থেকে মুক্ত হতে হবে এবং অতীত কর্মকান্ডের জন্য লজ্জিত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।

এ জন্যেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “অনুতপ্ত হওয়াই হলো তাওবা।”(আহমাদ, ইবনে মাজা, সহীহ আল-জামে ৬৮০২)
মহান আল্লাহ আকাংখা পোষণকারী অপারগকে কর্ম সম্পাদনকারীর মর্যাদায় ভূষিত করেছেন। আপনি জানেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি বলেছেন:
“দুনিয়া চার প্রকার লোকের জন্য;
(১) সেই বান্দার জন্য যাকে আল্লাহ মাল ও জ্ঞান দান করেছেন সুতরাং সে এতে তার প্রভূকে ভয় করছে, তার আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক রাখছে এবং তার ব্যাপারে আল্লাহর হক জানছে, এ হলো সর্বোত্তম অবস্থানে।
(২) সেই বান্দা যাকে আল্লাহ জ্ঞান দান করেছেন কিন্তু মাল দেননি, সে হলো সঠিক নিয়তের লোক, সে বলে, যদি আমার টাকা পয়সা থাকতো তাহলে উমুক ব্যাক্তির মত কাজ করতাম। সে তার নিয়ত অনুযায়ী সওয়াব পাবে। এদের দুজনের নেকী সমান হবে।
(৩) আর সেই বান্দা যাকে আল্লাহ টাকা পয়সা দিয়েছেন কিন্তু জ্ঞান দান করেননি। সে না জেনেই তার টাকা পয়সা খরচ করছে। এতে সে আল্লাহকে ভয় করে না, আত্মীয়তা রক্ষা করে না এবং এতে আল্লাহর হকও সে জানে না। সে হলো সর্ব নিকৃষ্ট অবস্থানে।
(৪) আর সেই বান্দা যাকে আল্লাহ মালও দেননি জ্ঞানও দেননি, সে বলে আমার টাকা পয়সা থাকলে উমুকের মতই (খারাপ কাজ) করতাম। সে তার নিয়ত অনুযায়ী প্রতিদান পাবে। এরা দুজনই গুনাহর দিক থেকে সমান। (আহমদ, তিরমিযী, সহীহুত তারগীব ওয়াত তারহীব: ১/৯)
[দুই]: পাপের কদর্যতা ও ভয়াবহতা অনুভব করা; অর্থাৎ সঠিক তাওবার সাথে কখনো আনন্দ ও মজা পাওয়া যাবেনা অতীত পাপের কথা স্মরণ হলে অথবা কখনো ভবিষ্যতে সেসব কাজে ফিরে যাবে, এ কামনা মনে স্থান পাবে না।
ইবনুল কাইয়্যেম রহমতুল্লাহ আলাইহে তার লিখা [الداء والدواء] ‘রোগ ও চিকিৎসা’ এবং [الفوائد] ‘আল্ফাওয়াইদ’ নামক গ্রন্থে গুনাহের অনেক ক্ষতির কথা উল্লেখ করেছেন। তন্মধ্যে: জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হওয়া, অন্তরে একাকিত্ব অনুভব করা, কাজকর্ম কঠিন হয়ে যাওয়া, শরীর দুর্বল হয়ে যাওয়া, আল্লাহর আনুগত্য থেকে বঞ্চিত হওয়া, বরকত কমে যাওয়া, কাজে সমন্বয় না হওয়া, গুনাহর কাজে অভ্যস্থ হয়ে যাওয়া, আল্লাহর ব্যাপারে পাপীর অনাসক্তি সৃষ্টি হয় এবং লোকজন তাকে অশ্রদ্ধা করে, জীবজন্তু তাকে অভিশাপ দেয়, সে সর্বদা অপমানিত হতে থাকে, অন্তরে মোহর পড়ে যায়, লানতের মাঝে পড়ে এবং দু’আ কবুল হয় না, জলে ও স্থলে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়, আত্মমর্যাদাবোধ কমে যায়, লজ্জা চলে যায়, নিয়ামত দূর হয়ে যায়, আজাব নেমে আসে, পাপীর অন্তরে সর্বদা ভয় নেমে আসে এবং সে শয়তানের দোসরে পরিণত হয়, তার জীবন সমাপ্ত হয় মন্দের উপর এবং পরকালীন আজাবে নিপতিত হয়।
পাপের এই ক্ষতি ও বিপর্যয় যদি বান্দা জানতে পারে তাহলে সে পাপ থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকবে। কিছু কিছু লোক এক পাপ ছেড়ে আরেক পাপ করতে শুরু করে তার কিছু কারণ হলো:
১. মনে করে যে, এর পাপ কিছুটা হালকা।
২. মন পাপের দিকে বেশী আকৃষ্ট হয় এবং এর দিকে ঝোক খুবই প্রবল থাকে।
৩. এ পাপ করার জন্য পারিপার্শিক অবস্থা সহজ ও সহায়ক হয় অন্যটির তুলনায়, অন্য পাপের মোকাবেলায় যার জন্য অনেক কিছু জোগাড় করা লাগে।
৪. তার সঙ্গী সাথীরা এ পাপের সাথে জড়িত, তাদেরকে ত্যাগ করা কঠিন বলে মনে হয়।

৫. কোন কোন ব্যক্তির নিকট বিশেষ পাপ তার মান সম্মানের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় তার সঙ্গী সাথীদের মাঝে। এজন্য সে চিন্তা করে যেন তার অবস্থান সে ধরে রাখে এবং এ পাপ অব্যাহত রাখে, যেমনটি ঘটে বিভিন্ন অপরাধ ও সন্ত্রাসী গ্র“পের প্রধানদের বেলায়। যেমনটি ঘটেছিল অশ্লীল কবি আবু নাওয়াসের বেলায়, যখন তাকে কবি আবুল আতাহিয়া উপদেশ দেয় ও ভর্ৎসনা করে তার পাপের জন্য। সে তখন জবাবে লিখে -
হে আতাহিয়া! তুমি কি চাও আমি
ছেড়ে দেই আনন্দ ফূর্তি করা
তুমি কি চাও আমি ধর্মকর্ম করে হারিয়ে ফেলি
আমার লোকদের কাছে আমার মর্যাদা।

[তিন]: যার জন্য তাওবার প্রয়োজন সে যেন তাড়াতাড়ি তাওবা করে। কারণ তাওবা করতে দেরী করাটাই পাপ।
[চার]: আল্লাহর হক যা ছুটে গেছে তা যথাসম্ভব আদায় করা। যেমন জাকাত দেয়া যা সে পূর্বে দেয়নি। কেননা এতে আবার দরিদ্র লোকজনের অধিকারও রয়েছে।
[পাঁচ]: পাপের স্থানকে ত্যাগ করা যদি সেখানে অবস্থান করলে আবার সে পাপে জড়িয়ে পড়ার আশংকা থাকে।
[ছয়]: যারা পাপ কাজে সহযোগিতা করে তাদেরকে পরিত্যাগ করা (এটিও পূর্ববর্তী ১০০টি লোক হত্যাকারীর হাদীস থেকে গ্রহণ করা হয়েছে।)
মহান আল্লাহ বলেন:

“আন্তরিক বন্ধুরাই সেদিন একে অপরের শত্রুতে পরিণত হবে, মুত্তাকীরা ছাড়া।” (সূরা আল-যুখরুফ: ৬৭)

খারাপ সাথীরা একে অপরকে কিয়ামতের দিন অভিশাপ দিবে। এজন্য হে তাওবাকারী, আপনাকে এদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে ও এদের থেকে সতর্ক থাকতে হবে, যদি আপনি তাদেরকে দাওয়াত দিতে অপারগ হন। শয়তান যেন আপনার ঘাড়ে আবার সওয়ার হবার সুযোগ না পায় এবং আপনাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে আবার কুপথে নিয়ে না যায়। আর আপনি তো জানেন যে, আপনি দুর্বল তাকে প্রতিরোধ করতে সক্ষম হবেন না। এ ধরণের অনেক ঘটনা রয়েছে যে, অনেক লোকই তার পুরাতন বন্ধু বান্ধবের সাথে সম্পর্কিত হওয়ার পর আবার পাপে জড়িয়ে পড়েছে।
[সাত]: নিজের কাছে রক্ষিত হারাম জিনিসকে নষ্ট করে ফেলা। যেমন মাদক দ্রব্য, বাদ্যযন্ত্র, যেমন একতারা, হারমনিয়াম, অথবা ছবি, ব্লু ফ্লিম, অশ্লীল নভেল নাটক। এগুলো নষ্ট করে ফেলতে হবে অথবা পুড়িয়ে ফেলতে হবে। তাওবাকারীকে সঠিক পথে দৃঢ়ভাবে থাকার জন্য অবশ্যই সব জাহেলিয়াতের জিনিস থেকে মুক্ত হতে হবে। এ ধরণের অনেক ঘটনা রয়েছে, যাতে দেখা যায়, এসব হারাম জিনিসই তাওবাকারীর পূর্বের অবস্থানে ফিরে যাবার পিছনে প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এর দ্বারাই সে পথভ্রষ্ট হয়েছে। আমরা আল্লাহর নিকট সঠিক পথে টিকে থাকার জন্য তাওফীক কামনা করছি।
[আট]: ভাল সঙ্গী-সাথী গ্রহণ করতে হবে যারা তাকে দ্বীনের ব্যাপারে সহায়তা করবে এবং এরা হবে খারাপ সঙ্গী সাথীর বিকল্প। আর চেষ্টা করতে হবে বিভিন্ন ধর্মীয় ও ইলমী আলোচনায় বসার জন্য। নিজেকে সব সময় এমন কাজে মশগুল রাখতে হবে যাতে কল্যাণ রয়েছে, যেন শয়তান তাকে পূর্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেবার সুযোগ না পায়।
[নয়]: নিজ শরীরের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে যাকে সে হারাম দিয়ে প্রতিপালন করেছে। একে আল্লাহর আনুগত্যের কাজে লাগাতে হবে এবং হালাল রুজি খেতে হবে যেন শরীরে আবার পবিত্র রক্ত-মাংস সৃষ্টি হয়।
[দশ]: তাওবা দম আটকে যাওয়া বা ফুরিয়ে যাবার (মৃত্যুর পূর্বক্ষণে শ্বাসকষ্ট শুরু হবার) পূর্বে এবং পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হবার পূর্বে হতে হবে। ঘড়ঘড়ার অর্থ হলো কণ্ঠনালী হতে এমন শব্দ বের হওয়া যা মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে হয়ে থাকে। এর উদ্দেশ্য হলো কিয়ামতের পূর্বেই তাওবা করতে হবে তা ছোট কিয়ামত হোক (মৃত্যু) বা বড় কিয়ামতই হোক (পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হওয়া)।
কেননা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি আল্লাহর নিকট তাওবা করবে ঘড়ঘড়া উঠার পূর্বে, আল্লাহ তার তাওবা কবুল করবেন।” (আহমাদ, তিরমিযী, সহীহ আল জামে’ : ৬১৩২)
Source: সরলপথ

আমি তাওবা করতে চাই কিন্তু! পর্ব-৩ – তাওবার শর্ত ও এর পরিপূরক বিষয়

শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু

তাওবা শব্দটি এক মহান শব্দ। এর অর্থ খুবই গভীর। এমন নয় যা অনেকেই মনে করে থাকেন, মুখে শব্দটি বললাম অতঃপর গুনাহে লিপ্ত থাকলাম। আপনি আল্লাহর নিম্নোক্ত বাণী অনুধাবন করে দেখুন। আল্লাহ্ কি বলছেন:

“তোমরা তোমাদের প্রভূর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। অতঃপর তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন (তাওবা) কর।” (সূরা হুদ: ৩)
আয়াতের মধ্যে সকলকে ক্ষমা চাইতে বলা হয়েছে, অতঃপর তাওবা করতে বলা হয়েছে। সুতরাং তাওবা হচ্ছে ক্ষমা প্রার্থনার পর অতিরিক্ত আলাদা বিষয়।
কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের জন্য অবশ্যই কিছু শর্ত থাকে। আলেম-ওলামাগণ কুরআন ও হাদীস মন্থন করে তাওবার জন্য কতিপয় শর্ত উল্লেখ করেছেন, তা হলো:

এক: দ্রুত পাপ থেকে বিরত হওয়া।

দুই: পূর্বে যা ঘটে গেছে সে জন্য অনুতপ্ত হওয়া।

তিন: পুনরায় পাপ কাজে ফিরে না আসার জন্য দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করা।

চার: প্রাপকদের হক ফিরিয়ে দেয়া যা অন্যায়ভাবে নেয়া হয়েছিল অথবা তাদের নিকট থেকে মাফ চেয়ে নেওয়া।
আর খালেসভাবে তাওবার জন্য কতিপয় আলেম যেসব শর্ত উল্লেখ করেছেন, নিম্নে সেগুলো উদাহরণসহ আলোচনা করা হচ্ছে।

[এক]: শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য পাপ ত্যাগ করা, অন্য কোন কারণে নয়, যেমন;
অক্ষমতার কারণে পাপ থেকে দূরে থাকা, এসব কর্ম করতে ভাল না লাগা অথবা লোকজন মন্দ বলবে এই ভয়ে পাপ ত্যাগ করা।
এজন্য তাকে তাওবাকারী বলা হবে না, যে ব্যক্তি পাপ ত্যাগ করেছে তার মানহানী ঘটায় বা এর জন্য হয়তো সে চাকুরীচ্যুত বা পদবী হারাতে পারে।
তাকে তাওবাকারী বলা যাবে না, যে ব্যক্তি পাপ ত্যাগ করল তার শক্তি ও স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য। যেমন; কেউ জেনা করা ত্যাগ করলো যেন দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে বাঁচতে পারে অথবা তার শরীর ও স্মৃতি শক্তিকে দুর্বল না করে।

তেমনিভাবে তাকে তাওবাকারী বলা যাবে না, যে ব্যক্তি চুরি করা ছেড়ে দিয়েছে; কোন বাড়ীতে ঢুকার পথ না পেয়ে বা সিন্দুক খুলতে অসমর্থ কিংবা পাহারাদার ও পুলিশের ভয়ে।
তাকে তাওবাকারী বলা যাবে না, যে দূর্নীতি দমন বিভাগের লোকজনদের জোর তৎপরতায় ধরা পড়ার ভয়ে ঘুষ খাওয়া বন্দ রেখেছে।

আর তাকেও তাওবাকারী বলা যাবে না, যে ব্যক্তি মদ পান, মাদকদ্রব্য বা হেরোইন সেবন ইত্যাদি ছেড়ে দিয়েছে দারিদ্রের কারণে।
তেমনিভাবে তাকেও তাওবাকারী বলা যাবে না, যে সামর্থহীন হওয়ার কারণে গুনাহ করা ছেড়ে দিলো। যেমন মিথ্যা বলা ছেড়ে দিয়েছে তার কথায় জড়তা সৃষ্টি হওয়ার কারণে কিংবা জেনা করছে না যেহেতু সে সহবাস ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে, কিংবা চুরি করা ছেড়ে দিয়েছে আহত হয়ে পঙ্গু হয়ে পড়ার কারণে।
বরং এসবে অবশ্যই অনুতপ্ত হতে হবে, সব ধরনের পাপ থেকে মুক্ত হতে হবে এবং অতীত কর্মকান্ডের জন্য লজ্জিত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।

এ জন্যেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “অনুতপ্ত হওয়াই হলো তাওবা।”(আহমাদ, ইবনে মাজা, সহীহ আল-জামে ৬৮০২)
মহান আল্লাহ আকাংখা পোষণকারী অপারগকে কর্ম সম্পাদনকারীর মর্যাদায় ভূষিত করেছেন। আপনি জানেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি বলেছেন:
“দুনিয়া চার প্রকার লোকের জন্য;
(১) সেই বান্দার জন্য যাকে আল্লাহ মাল ও জ্ঞান দান করেছেন সুতরাং সে এতে তার প্রভূকে ভয় করছে, তার আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক রাখছে এবং তার ব্যাপারে আল্লাহর হক জানছে, এ হলো সর্বোত্তম অবস্থানে।
(২) সেই বান্দা যাকে আল্লাহ জ্ঞান দান করেছেন কিন্তু মাল দেননি, সে হলো সঠিক নিয়তের লোক, সে বলে, যদি আমার টাকা পয়সা থাকতো তাহলে উমুক ব্যাক্তির মত কাজ করতাম। সে তার নিয়ত অনুযায়ী সওয়াব পাবে। এদের দুজনের নেকী সমান হবে।
(৩) আর সেই বান্দা যাকে আল্লাহ টাকা পয়সা দিয়েছেন কিন্তু জ্ঞান দান করেননি। সে না জেনেই তার টাকা পয়সা খরচ করছে। এতে সে আল্লাহকে ভয় করে না, আত্মীয়তা রক্ষা করে না এবং এতে আল্লাহর হকও সে জানে না। সে হলো সর্ব নিকৃষ্ট অবস্থানে।
(৪) আর সেই বান্দা যাকে আল্লাহ মালও দেননি জ্ঞানও দেননি, সে বলে আমার টাকা পয়সা থাকলে উমুকের মতই (খারাপ কাজ) করতাম। সে তার নিয়ত অনুযায়ী প্রতিদান পাবে। এরা দুজনই গুনাহর দিক থেকে সমান। (আহমদ, তিরমিযী, সহীহুত তারগীব ওয়াত তারহীব: ১/৯)
[দুই]: পাপের কদর্যতা ও ভয়াবহতা অনুভব করা; অর্থাৎ সঠিক তাওবার সাথে কখনো আনন্দ ও মজা পাওয়া যাবেনা অতীত পাপের কথা স্মরণ হলে অথবা কখনো ভবিষ্যতে সেসব কাজে ফিরে যাবে, এ কামনা মনে স্থান পাবে না।
ইবনুল কাইয়্যেম রহমতুল্লাহ আলাইহে তার লিখা [الداء والدواء] ‘রোগ ও চিকিৎসা’ এবং [الفوائد] ‘আল্ফাওয়াইদ’ নামক গ্রন্থে গুনাহের অনেক ক্ষতির কথা উল্লেখ করেছেন। তন্মধ্যে: জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হওয়া, অন্তরে একাকিত্ব অনুভব করা, কাজকর্ম কঠিন হয়ে যাওয়া, শরীর দুর্বল হয়ে যাওয়া, আল্লাহর আনুগত্য থেকে বঞ্চিত হওয়া, বরকত কমে যাওয়া, কাজে সমন্বয় না হওয়া, গুনাহর কাজে অভ্যস্থ হয়ে যাওয়া, আল্লাহর ব্যাপারে পাপীর অনাসক্তি সৃষ্টি হয় এবং লোকজন তাকে অশ্রদ্ধা করে, জীবজন্তু তাকে অভিশাপ দেয়, সে সর্বদা অপমানিত হতে থাকে, অন্তরে মোহর পড়ে যায়, লানতের মাঝে পড়ে এবং দু’আ কবুল হয় না, জলে ও স্থলে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়, আত্মমর্যাদাবোধ কমে যায়, লজ্জা চলে যায়, নিয়ামত দূর হয়ে যায়, আজাব নেমে আসে, পাপীর অন্তরে সর্বদা ভয় নেমে আসে এবং সে শয়তানের দোসরে পরিণত হয়, তার জীবন সমাপ্ত হয় মন্দের উপর এবং পরকালীন আজাবে নিপতিত হয়।
পাপের এই ক্ষতি ও বিপর্যয় যদি বান্দা জানতে পারে তাহলে সে পাপ থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকবে। কিছু কিছু লোক এক পাপ ছেড়ে আরেক পাপ করতে শুরু করে তার কিছু কারণ হলো:
১. মনে করে যে, এর পাপ কিছুটা হালকা।
২. মন পাপের দিকে বেশী আকৃষ্ট হয় এবং এর দিকে ঝোক খুবই প্রবল থাকে।
৩. এ পাপ করার জন্য পারিপার্শিক অবস্থা সহজ ও সহায়ক হয় অন্যটির তুলনায়, অন্য পাপের মোকাবেলায় যার জন্য অনেক কিছু জোগাড় করা লাগে।
৪. তার সঙ্গী সাথীরা এ পাপের সাথে জড়িত, তাদেরকে ত্যাগ করা কঠিন বলে মনে হয়।

৫. কোন কোন ব্যক্তির নিকট বিশেষ পাপ তার মান সম্মানের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় তার সঙ্গী সাথীদের মাঝে। এজন্য সে চিন্তা করে যেন তার অবস্থান সে ধরে রাখে এবং এ পাপ অব্যাহত রাখে, যেমনটি ঘটে বিভিন্ন অপরাধ ও সন্ত্রাসী গ্র“পের প্রধানদের বেলায়। যেমনটি ঘটেছিল অশ্লীল কবি আবু নাওয়াসের বেলায়, যখন তাকে কবি আবুল আতাহিয়া উপদেশ দেয় ও ভর্ৎসনা করে তার পাপের জন্য। সে তখন জবাবে লিখে -
হে আতাহিয়া! তুমি কি চাও আমি
ছেড়ে দেই আনন্দ ফূর্তি করা
তুমি কি চাও আমি ধর্মকর্ম করে হারিয়ে ফেলি
আমার লোকদের কাছে আমার মর্যাদা।

[তিন]: যার জন্য তাওবার প্রয়োজন সে যেন তাড়াতাড়ি তাওবা করে। কারণ তাওবা করতে দেরী করাটাই পাপ।
[চার]: আল্লাহর হক যা ছুটে গেছে তা যথাসম্ভব আদায় করা। যেমন জাকাত দেয়া যা সে পূর্বে দেয়নি। কেননা এতে আবার দরিদ্র লোকজনের অধিকারও রয়েছে।
[পাঁচ]: পাপের স্থানকে ত্যাগ করা যদি সেখানে অবস্থান করলে আবার সে পাপে জড়িয়ে পড়ার আশংকা থাকে।
[ছয়]: যারা পাপ কাজে সহযোগিতা করে তাদেরকে পরিত্যাগ করা (এটিও পূর্ববর্তী ১০০টি লোক হত্যাকারীর হাদীস থেকে গ্রহণ করা হয়েছে।)
মহান আল্লাহ বলেন:

“আন্তরিক বন্ধুরাই সেদিন একে অপরের শত্রুতে পরিণত হবে, মুত্তাকীরা ছাড়া।” (সূরা আল-যুখরুফ: ৬৭)

খারাপ সাথীরা একে অপরকে কিয়ামতের দিন অভিশাপ দিবে। এজন্য হে তাওবাকারী, আপনাকে এদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে ও এদের থেকে সতর্ক থাকতে হবে, যদি আপনি তাদেরকে দাওয়াত দিতে অপারগ হন। শয়তান যেন আপনার ঘাড়ে আবার সওয়ার হবার সুযোগ না পায় এবং আপনাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে আবার কুপথে নিয়ে না যায়। আর আপনি তো জানেন যে, আপনি দুর্বল তাকে প্রতিরোধ করতে সক্ষম হবেন না। এ ধরণের অনেক ঘটনা রয়েছে যে, অনেক লোকই তার পুরাতন বন্ধু বান্ধবের সাথে সম্পর্কিত হওয়ার পর আবার পাপে জড়িয়ে পড়েছে।
[সাত]: নিজের কাছে রক্ষিত হারাম জিনিসকে নষ্ট করে ফেলা। যেমন মাদক দ্রব্য, বাদ্যযন্ত্র, যেমন একতারা, হারমনিয়াম, অথবা ছবি, ব্লু ফ্লিম, অশ্লীল নভেল নাটক। এগুলো নষ্ট করে ফেলতে হবে অথবা পুড়িয়ে ফেলতে হবে। তাওবাকারীকে সঠিক পথে দৃঢ়ভাবে থাকার জন্য অবশ্যই সব জাহেলিয়াতের জিনিস থেকে মুক্ত হতে হবে। এ ধরণের অনেক ঘটনা রয়েছে, যাতে দেখা যায়, এসব হারাম জিনিসই তাওবাকারীর পূর্বের অবস্থানে ফিরে যাবার পিছনে প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এর দ্বারাই সে পথভ্রষ্ট হয়েছে। আমরা আল্লাহর নিকট সঠিক পথে টিকে থাকার জন্য তাওফীক কামনা করছি।
[আট]: ভাল সঙ্গী-সাথী গ্রহণ করতে হবে যারা তাকে দ্বীনের ব্যাপারে সহায়তা করবে এবং এরা হবে খারাপ সঙ্গী সাথীর বিকল্প। আর চেষ্টা করতে হবে বিভিন্ন ধর্মীয় ও ইলমী আলোচনায় বসার জন্য। নিজেকে সব সময় এমন কাজে মশগুল রাখতে হবে যাতে কল্যাণ রয়েছে, যেন শয়তান তাকে পূর্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেবার সুযোগ না পায়।
[নয়]: নিজ শরীরের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে যাকে সে হারাম দিয়ে প্রতিপালন করেছে। একে আল্লাহর আনুগত্যের কাজে লাগাতে হবে এবং হালাল রুজি খেতে হবে যেন শরীরে আবার পবিত্র রক্ত-মাংস সৃষ্টি হয়।
[দশ]: তাওবা দম আটকে যাওয়া বা ফুরিয়ে যাবার (মৃত্যুর পূর্বক্ষণে শ্বাসকষ্ট শুরু হবার) পূর্বে এবং পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হবার পূর্বে হতে হবে। ঘড়ঘড়ার অর্থ হলো কণ্ঠনালী হতে এমন শব্দ বের হওয়া যা মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে হয়ে থাকে। এর উদ্দেশ্য হলো কিয়ামতের পূর্বেই তাওবা করতে হবে তা ছোট কিয়ামত হোক (মৃত্যু) বা বড় কিয়ামতই হোক (পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হওয়া)।
কেননা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি আল্লাহর নিকট তাওবা করবে ঘড়ঘড়া উঠার পূর্বে, আল্লাহ তার তাওবা কবুল করবেন।” (আহমাদ, তিরমিযী, সহীহ আল জামে’ : ৬১৩২)
Source: সরলপথ

আমি তাওবা করতে চাই কিন্তু! পর্ব-৩ – তাওবার শর্ত ও এর পরিপূরক বিষয়

শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু

তাওবা শব্দটি এক মহান শব্দ। এর অর্থ খুবই গভীর। এমন নয় যা অনেকেই মনে করে থাকেন, মুখে শব্দটি বললাম অতঃপর গুনাহে লিপ্ত থাকলাম। আপনি আল্লাহর নিম্নোক্ত বাণী অনুধাবন করে দেখুন। আল্লাহ্ কি বলছেন:

“তোমরা তোমাদের প্রভূর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। অতঃপর তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন (তাওবা) কর।” (সূরা হুদ: ৩)
আয়াতের মধ্যে সকলকে ক্ষমা চাইতে বলা হয়েছে, অতঃপর তাওবা করতে বলা হয়েছে। সুতরাং তাওবা হচ্ছে ক্ষমা প্রার্থনার পর অতিরিক্ত আলাদা বিষয়।
কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের জন্য অবশ্যই কিছু শর্ত থাকে। আলেম-ওলামাগণ কুরআন ও হাদীস মন্থন করে তাওবার জন্য কতিপয় শর্ত উল্লেখ করেছেন, তা হলো:

এক: দ্রুত পাপ থেকে বিরত হওয়া।

দুই: পূর্বে যা ঘটে গেছে সে জন্য অনুতপ্ত হওয়া।

তিন: পুনরায় পাপ কাজে ফিরে না আসার জন্য দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করা।

চার: প্রাপকদের হক ফিরিয়ে দেয়া যা অন্যায়ভাবে নেয়া হয়েছিল অথবা তাদের নিকট থেকে মাফ চেয়ে নেওয়া।
আর খালেসভাবে তাওবার জন্য কতিপয় আলেম যেসব শর্ত উল্লেখ করেছেন, নিম্নে সেগুলো উদাহরণসহ আলোচনা করা হচ্ছে।

[এক]: শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য পাপ ত্যাগ করা, অন্য কোন কারণে নয়, যেমন;
অক্ষমতার কারণে পাপ থেকে দূরে থাকা, এসব কর্ম করতে ভাল না লাগা অথবা লোকজন মন্দ বলবে এই ভয়ে পাপ ত্যাগ করা।
এজন্য তাকে তাওবাকারী বলা হবে না, যে ব্যক্তি পাপ ত্যাগ করেছে তার মানহানী ঘটায় বা এর জন্য হয়তো সে চাকুরীচ্যুত বা পদবী হারাতে পারে।
তাকে তাওবাকারী বলা যাবে না, যে ব্যক্তি পাপ ত্যাগ করল তার শক্তি ও স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য। যেমন; কেউ জেনা করা ত্যাগ করলো যেন দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে বাঁচতে পারে অথবা তার শরীর ও স্মৃতি শক্তিকে দুর্বল না করে।

তেমনিভাবে তাকে তাওবাকারী বলা যাবে না, যে ব্যক্তি চুরি করা ছেড়ে দিয়েছে; কোন বাড়ীতে ঢুকার পথ না পেয়ে বা সিন্দুক খুলতে অসমর্থ কিংবা পাহারাদার ও পুলিশের ভয়ে।
তাকে তাওবাকারী বলা যাবে না, যে দূর্নীতি দমন বিভাগের লোকজনদের জোর তৎপরতায় ধরা পড়ার ভয়ে ঘুষ খাওয়া বন্দ রেখেছে।

আর তাকেও তাওবাকারী বলা যাবে না, যে ব্যক্তি মদ পান, মাদকদ্রব্য বা হেরোইন সেবন ইত্যাদি ছেড়ে দিয়েছে দারিদ্রের কারণে।
তেমনিভাবে তাকেও তাওবাকারী বলা যাবে না, যে সামর্থহীন হওয়ার কারণে গুনাহ করা ছেড়ে দিলো। যেমন মিথ্যা বলা ছেড়ে দিয়েছে তার কথায় জড়তা সৃষ্টি হওয়ার কারণে কিংবা জেনা করছে না যেহেতু সে সহবাস ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে, কিংবা চুরি করা ছেড়ে দিয়েছে আহত হয়ে পঙ্গু হয়ে পড়ার কারণে।
বরং এসবে অবশ্যই অনুতপ্ত হতে হবে, সব ধরনের পাপ থেকে মুক্ত হতে হবে এবং অতীত কর্মকান্ডের জন্য লজ্জিত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।

এ জন্যেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “অনুতপ্ত হওয়াই হলো তাওবা।”(আহমাদ, ইবনে মাজা, সহীহ আল-জামে ৬৮০২)
মহান আল্লাহ আকাংখা পোষণকারী অপারগকে কর্ম সম্পাদনকারীর মর্যাদায় ভূষিত করেছেন। আপনি জানেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি বলেছেন:
“দুনিয়া চার প্রকার লোকের জন্য;
(১) সেই বান্দার জন্য যাকে আল্লাহ মাল ও জ্ঞান দান করেছেন সুতরাং সে এতে তার প্রভূকে ভয় করছে, তার আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক রাখছে এবং তার ব্যাপারে আল্লাহর হক জানছে, এ হলো সর্বোত্তম অবস্থানে।
(২) সেই বান্দা যাকে আল্লাহ জ্ঞান দান করেছেন কিন্তু মাল দেননি, সে হলো সঠিক নিয়তের লোক, সে বলে, যদি আমার টাকা পয়সা থাকতো তাহলে উমুক ব্যাক্তির মত কাজ করতাম। সে তার নিয়ত অনুযায়ী সওয়াব পাবে। এদের দুজনের নেকী সমান হবে।
(৩) আর সেই বান্দা যাকে আল্লাহ টাকা পয়সা দিয়েছেন কিন্তু জ্ঞান দান করেননি। সে না জেনেই তার টাকা পয়সা খরচ করছে। এতে সে আল্লাহকে ভয় করে না, আত্মীয়তা রক্ষা করে না এবং এতে আল্লাহর হকও সে জানে না। সে হলো সর্ব নিকৃষ্ট অবস্থানে।
(৪) আর সেই বান্দা যাকে আল্লাহ মালও দেননি জ্ঞানও দেননি, সে বলে আমার টাকা পয়সা থাকলে উমুকের মতই (খারাপ কাজ) করতাম। সে তার নিয়ত অনুযায়ী প্রতিদান পাবে। এরা দুজনই গুনাহর দিক থেকে সমান। (আহমদ, তিরমিযী, সহীহুত তারগীব ওয়াত তারহীব: ১/৯)
[দুই]: পাপের কদর্যতা ও ভয়াবহতা অনুভব করা; অর্থাৎ সঠিক তাওবার সাথে কখনো আনন্দ ও মজা পাওয়া যাবেনা অতীত পাপের কথা স্মরণ হলে অথবা কখনো ভবিষ্যতে সেসব কাজে ফিরে যাবে, এ কামনা মনে স্থান পাবে না।
ইবনুল কাইয়্যেম রহমতুল্লাহ আলাইহে তার লিখা [الداء والدواء] ‘রোগ ও চিকিৎসা’ এবং [الفوائد] ‘আল্ফাওয়াইদ’ নামক গ্রন্থে গুনাহের অনেক ক্ষতির কথা উল্লেখ করেছেন। তন্মধ্যে: জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হওয়া, অন্তরে একাকিত্ব অনুভব করা, কাজকর্ম কঠিন হয়ে যাওয়া, শরীর দুর্বল হয়ে যাওয়া, আল্লাহর আনুগত্য থেকে বঞ্চিত হওয়া, বরকত কমে যাওয়া, কাজে সমন্বয় না হওয়া, গুনাহর কাজে অভ্যস্থ হয়ে যাওয়া, আল্লাহর ব্যাপারে পাপীর অনাসক্তি সৃষ্টি হয় এবং লোকজন তাকে অশ্রদ্ধা করে, জীবজন্তু তাকে অভিশাপ দেয়, সে সর্বদা অপমানিত হতে থাকে, অন্তরে মোহর পড়ে যায়, লানতের মাঝে পড়ে এবং দু’আ কবুল হয় না, জলে ও স্থলে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়, আত্মমর্যাদাবোধ কমে যায়, লজ্জা চলে যায়, নিয়ামত দূর হয়ে যায়, আজাব নেমে আসে, পাপীর অন্তরে সর্বদা ভয় নেমে আসে এবং সে শয়তানের দোসরে পরিণত হয়, তার জীবন সমাপ্ত হয় মন্দের উপর এবং পরকালীন আজাবে নিপতিত হয়।
পাপের এই ক্ষতি ও বিপর্যয় যদি বান্দা জানতে পারে তাহলে সে পাপ থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকবে। কিছু কিছু লোক এক পাপ ছেড়ে আরেক পাপ করতে শুরু করে তার কিছু কারণ হলো:
১. মনে করে যে, এর পাপ কিছুটা হালকা।
২. মন পাপের দিকে বেশী আকৃষ্ট হয় এবং এর দিকে ঝোক খুবই প্রবল থাকে।
৩. এ পাপ করার জন্য পারিপার্শিক অবস্থা সহজ ও সহায়ক হয় অন্যটির তুলনায়, অন্য পাপের মোকাবেলায় যার জন্য অনেক কিছু জোগাড় করা লাগে।
৪. তার সঙ্গী সাথীরা এ পাপের সাথে জড়িত, তাদেরকে ত্যাগ করা কঠিন বলে মনে হয়।

৫. কোন কোন ব্যক্তির নিকট বিশেষ পাপ তার মান সম্মানের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় তার সঙ্গী সাথীদের মাঝে। এজন্য সে চিন্তা করে যেন তার অবস্থান সে ধরে রাখে এবং এ পাপ অব্যাহত রাখে, যেমনটি ঘটে বিভিন্ন অপরাধ ও সন্ত্রাসী গ্র“পের প্রধানদের বেলায়। যেমনটি ঘটেছিল অশ্লীল কবি আবু নাওয়াসের বেলায়, যখন তাকে কবি আবুল আতাহিয়া উপদেশ দেয় ও ভর্ৎসনা করে তার পাপের জন্য। সে তখন জবাবে লিখে -
হে আতাহিয়া! তুমি কি চাও আমি
ছেড়ে দেই আনন্দ ফূর্তি করা
তুমি কি চাও আমি ধর্মকর্ম করে হারিয়ে ফেলি
আমার লোকদের কাছে আমার মর্যাদা।

[তিন]: যার জন্য তাওবার প্রয়োজন সে যেন তাড়াতাড়ি তাওবা করে। কারণ তাওবা করতে দেরী করাটাই পাপ।
[চার]: আল্লাহর হক যা ছুটে গেছে তা যথাসম্ভব আদায় করা। যেমন জাকাত দেয়া যা সে পূর্বে দেয়নি। কেননা এতে আবার দরিদ্র লোকজনের অধিকারও রয়েছে।
[পাঁচ]: পাপের স্থানকে ত্যাগ করা যদি সেখানে অবস্থান করলে আবার সে পাপে জড়িয়ে পড়ার আশংকা থাকে।
[ছয়]: যারা পাপ কাজে সহযোগিতা করে তাদেরকে পরিত্যাগ করা (এটিও পূর্ববর্তী ১০০টি লোক হত্যাকারীর হাদীস থেকে গ্রহণ করা হয়েছে।)
মহান আল্লাহ বলেন:

“আন্তরিক বন্ধুরাই সেদিন একে অপরের শত্রুতে পরিণত হবে, মুত্তাকীরা ছাড়া।” (সূরা আল-যুখরুফ: ৬৭)

খারাপ সাথীরা একে অপরকে কিয়ামতের দিন অভিশাপ দিবে। এজন্য হে তাওবাকারী, আপনাকে এদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে ও এদের থেকে সতর্ক থাকতে হবে, যদি আপনি তাদেরকে দাওয়াত দিতে অপারগ হন। শয়তান যেন আপনার ঘাড়ে আবার সওয়ার হবার সুযোগ না পায় এবং আপনাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে আবার কুপথে নিয়ে না যায়। আর আপনি তো জানেন যে, আপনি দুর্বল তাকে প্রতিরোধ করতে সক্ষম হবেন না। এ ধরণের অনেক ঘটনা রয়েছে যে, অনেক লোকই তার পুরাতন বন্ধু বান্ধবের সাথে সম্পর্কিত হওয়ার পর আবার পাপে জড়িয়ে পড়েছে।
[সাত]: নিজের কাছে রক্ষিত হারাম জিনিসকে নষ্ট করে ফেলা। যেমন মাদক দ্রব্য, বাদ্যযন্ত্র, যেমন একতারা, হারমনিয়াম, অথবা ছবি, ব্লু ফ্লিম, অশ্লীল নভেল নাটক। এগুলো নষ্ট করে ফেলতে হবে অথবা পুড়িয়ে ফেলতে হবে। তাওবাকারীকে সঠিক পথে দৃঢ়ভাবে থাকার জন্য অবশ্যই সব জাহেলিয়াতের জিনিস থেকে মুক্ত হতে হবে। এ ধরণের অনেক ঘটনা রয়েছে, যাতে দেখা যায়, এসব হারাম জিনিসই তাওবাকারীর পূর্বের অবস্থানে ফিরে যাবার পিছনে প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এর দ্বারাই সে পথভ্রষ্ট হয়েছে। আমরা আল্লাহর নিকট সঠিক পথে টিকে থাকার জন্য তাওফীক কামনা করছি।
[আট]: ভাল সঙ্গী-সাথী গ্রহণ করতে হবে যারা তাকে দ্বীনের ব্যাপারে সহায়তা করবে এবং এরা হবে খারাপ সঙ্গী সাথীর বিকল্প। আর চেষ্টা করতে হবে বিভিন্ন ধর্মীয় ও ইলমী আলোচনায় বসার জন্য। নিজেকে সব সময় এমন কাজে মশগুল রাখতে হবে যাতে কল্যাণ রয়েছে, যেন শয়তান তাকে পূর্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেবার সুযোগ না পায়।
[নয়]: নিজ শরীরের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে যাকে সে হারাম দিয়ে প্রতিপালন করেছে। একে আল্লাহর আনুগত্যের কাজে লাগাতে হবে এবং হালাল রুজি খেতে হবে যেন শরীরে আবার পবিত্র রক্ত-মাংস সৃষ্টি হয়।
[দশ]: তাওবা দম আটকে যাওয়া বা ফুরিয়ে যাবার (মৃত্যুর পূর্বক্ষণে শ্বাসকষ্ট শুরু হবার) পূর্বে এবং পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হবার পূর্বে হতে হবে। ঘড়ঘড়ার অর্থ হলো কণ্ঠনালী হতে এমন শব্দ বের হওয়া যা মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে হয়ে থাকে। এর উদ্দেশ্য হলো কিয়ামতের পূর্বেই তাওবা করতে হবে তা ছোট কিয়ামত হোক (মৃত্যু) বা বড় কিয়ামতই হোক (পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হওয়া)।
কেননা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি আল্লাহর নিকট তাওবা করবে ঘড়ঘড়া উঠার পূর্বে, আল্লাহ তার তাওবা কবুল করবেন।” (আহমাদ, তিরমিযী, সহীহ আল জামে’ : ৬১৩২)
Source: সরলপথ

আমি তাওবা করতে চাই কিন্তু! পর্ব-৩ – তাওবার শর্ত ও এর পরিপূরক বিষয়

শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু

তাওবা শব্দটি এক মহান শব্দ। এর অর্থ খুবই গভীর। এমন নয় যা অনেকেই মনে করে থাকেন, মুখে শব্দটি বললাম অতঃপর গুনাহে লিপ্ত থাকলাম। আপনি আল্লাহর নিম্নোক্ত বাণী অনুধাবন করে দেখুন। আল্লাহ্ কি বলছেন:

“তোমরা তোমাদের প্রভূর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। অতঃপর তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন (তাওবা) কর।” (সূরা হুদ: ৩)
আয়াতের মধ্যে সকলকে ক্ষমা চাইতে বলা হয়েছে, অতঃপর তাওবা করতে বলা হয়েছে। সুতরাং তাওবা হচ্ছে ক্ষমা প্রার্থনার পর অতিরিক্ত আলাদা বিষয়।
কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের জন্য অবশ্যই কিছু শর্ত থাকে। আলেম-ওলামাগণ কুরআন ও হাদীস মন্থন করে তাওবার জন্য কতিপয় শর্ত উল্লেখ করেছেন, তা হলো:

এক: দ্রুত পাপ থেকে বিরত হওয়া।

দুই: পূর্বে যা ঘটে গেছে সে জন্য অনুতপ্ত হওয়া।

তিন: পুনরায় পাপ কাজে ফিরে না আসার জন্য দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করা।

চার: প্রাপকদের হক ফিরিয়ে দেয়া যা অন্যায়ভাবে নেয়া হয়েছিল অথবা তাদের নিকট থেকে মাফ চেয়ে নেওয়া।
আর খালেসভাবে তাওবার জন্য কতিপয় আলেম যেসব শর্ত উল্লেখ করেছেন, নিম্নে সেগুলো উদাহরণসহ আলোচনা করা হচ্ছে।

[এক]: শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য পাপ ত্যাগ করা, অন্য কোন কারণে নয়, যেমন;
অক্ষমতার কারণে পাপ থেকে দূরে থাকা, এসব কর্ম করতে ভাল না লাগা অথবা লোকজন মন্দ বলবে এই ভয়ে পাপ ত্যাগ করা।
এজন্য তাকে তাওবাকারী বলা হবে না, যে ব্যক্তি পাপ ত্যাগ করেছে তার মানহানী ঘটায় বা এর জন্য হয়তো সে চাকুরীচ্যুত বা পদবী হারাতে পারে।
তাকে তাওবাকারী বলা যাবে না, যে ব্যক্তি পাপ ত্যাগ করল তার শক্তি ও স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য। যেমন; কেউ জেনা করা ত্যাগ করলো যেন দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে বাঁচতে পারে অথবা তার শরীর ও স্মৃতি শক্তিকে দুর্বল না করে।

তেমনিভাবে তাকে তাওবাকারী বলা যাবে না, যে ব্যক্তি চুরি করা ছেড়ে দিয়েছে; কোন বাড়ীতে ঢুকার পথ না পেয়ে বা সিন্দুক খুলতে অসমর্থ কিংবা পাহারাদার ও পুলিশের ভয়ে।
তাকে তাওবাকারী বলা যাবে না, যে দূর্নীতি দমন বিভাগের লোকজনদের জোর তৎপরতায় ধরা পড়ার ভয়ে ঘুষ খাওয়া বন্দ রেখেছে।

আর তাকেও তাওবাকারী বলা যাবে না, যে ব্যক্তি মদ পান, মাদকদ্রব্য বা হেরোইন সেবন ইত্যাদি ছেড়ে দিয়েছে দারিদ্রের কারণে।
তেমনিভাবে তাকেও তাওবাকারী বলা যাবে না, যে সামর্থহীন হওয়ার কারণে গুনাহ করা ছেড়ে দিলো। যেমন মিথ্যা বলা ছেড়ে দিয়েছে তার কথায় জড়তা সৃষ্টি হওয়ার কারণে কিংবা জেনা করছে না যেহেতু সে সহবাস ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে, কিংবা চুরি করা ছেড়ে দিয়েছে আহত হয়ে পঙ্গু হয়ে পড়ার কারণে।
বরং এসবে অবশ্যই অনুতপ্ত হতে হবে, সব ধরনের পাপ থেকে মুক্ত হতে হবে এবং অতীত কর্মকান্ডের জন্য লজ্জিত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।

এ জন্যেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “অনুতপ্ত হওয়াই হলো তাওবা।”(আহমাদ, ইবনে মাজা, সহীহ আল-জামে ৬৮০২)
মহান আল্লাহ আকাংখা পোষণকারী অপারগকে কর্ম সম্পাদনকারীর মর্যাদায় ভূষিত করেছেন। আপনি জানেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি বলেছেন:
“দুনিয়া চার প্রকার লোকের জন্য;
(১) সেই বান্দার জন্য যাকে আল্লাহ মাল ও জ্ঞান দান করেছেন সুতরাং সে এতে তার প্রভূকে ভয় করছে, তার আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক রাখছে এবং তার ব্যাপারে আল্লাহর হক জানছে, এ হলো সর্বোত্তম অবস্থানে।
(২) সেই বান্দা যাকে আল্লাহ জ্ঞান দান করেছেন কিন্তু মাল দেননি, সে হলো সঠিক নিয়তের লোক, সে বলে, যদি আমার টাকা পয়সা থাকতো তাহলে উমুক ব্যাক্তির মত কাজ করতাম। সে তার নিয়ত অনুযায়ী সওয়াব পাবে। এদের দুজনের নেকী সমান হবে।
(৩) আর সেই বান্দা যাকে আল্লাহ টাকা পয়সা দিয়েছেন কিন্তু জ্ঞান দান করেননি। সে না জেনেই তার টাকা পয়সা খরচ করছে। এতে সে আল্লাহকে ভয় করে না, আত্মীয়তা রক্ষা করে না এবং এতে আল্লাহর হকও সে জানে না। সে হলো সর্ব নিকৃষ্ট অবস্থানে।
(৪) আর সেই বান্দা যাকে আল্লাহ মালও দেননি জ্ঞানও দেননি, সে বলে আমার টাকা পয়সা থাকলে উমুকের মতই (খারাপ কাজ) করতাম। সে তার নিয়ত অনুযায়ী প্রতিদান পাবে। এরা দুজনই গুনাহর দিক থেকে সমান। (আহমদ, তিরমিযী, সহীহুত তারগীব ওয়াত তারহীব: ১/৯)
[দুই]: পাপের কদর্যতা ও ভয়াবহতা অনুভব করা; অর্থাৎ সঠিক তাওবার সাথে কখনো আনন্দ ও মজা পাওয়া যাবেনা অতীত পাপের কথা স্মরণ হলে অথবা কখনো ভবিষ্যতে সেসব কাজে ফিরে যাবে, এ কামনা মনে স্থান পাবে না।
ইবনুল কাইয়্যেম রহমতুল্লাহ আলাইহে তার লিখা [الداء والدواء] ‘রোগ ও চিকিৎসা’ এবং [الفوائد] ‘আল্ফাওয়াইদ’ নামক গ্রন্থে গুনাহের অনেক ক্ষতির কথা উল্লেখ করেছেন। তন্মধ্যে: জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হওয়া, অন্তরে একাকিত্ব অনুভব করা, কাজকর্ম কঠিন হয়ে যাওয়া, শরীর দুর্বল হয়ে যাওয়া, আল্লাহর আনুগত্য থেকে বঞ্চিত হওয়া, বরকত কমে যাওয়া, কাজে সমন্বয় না হওয়া, গুনাহর কাজে অভ্যস্থ হয়ে যাওয়া, আল্লাহর ব্যাপারে পাপীর অনাসক্তি সৃষ্টি হয় এবং লোকজন তাকে অশ্রদ্ধা করে, জীবজন্তু তাকে অভিশাপ দেয়, সে সর্বদা অপমানিত হতে থাকে, অন্তরে মোহর পড়ে যায়, লানতের মাঝে পড়ে এবং দু’আ কবুল হয় না, জলে ও স্থলে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়, আত্মমর্যাদাবোধ কমে যায়, লজ্জা চলে যায়, নিয়ামত দূর হয়ে যায়, আজাব নেমে আসে, পাপীর অন্তরে সর্বদা ভয় নেমে আসে এবং সে শয়তানের দোসরে পরিণত হয়, তার জীবন সমাপ্ত হয় মন্দের উপর এবং পরকালীন আজাবে নিপতিত হয়।
পাপের এই ক্ষতি ও বিপর্যয় যদি বান্দা জানতে পারে তাহলে সে পাপ থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকবে। কিছু কিছু লোক এক পাপ ছেড়ে আরেক পাপ করতে শুরু করে তার কিছু কারণ হলো:
১. মনে করে যে, এর পাপ কিছুটা হালকা।
২. মন পাপের দিকে বেশী আকৃষ্ট হয় এবং এর দিকে ঝোক খুবই প্রবল থাকে।
৩. এ পাপ করার জন্য পারিপার্শিক অবস্থা সহজ ও সহায়ক হয় অন্যটির তুলনায়, অন্য পাপের মোকাবেলায় যার জন্য অনেক কিছু জোগাড় করা লাগে।
৪. তার সঙ্গী সাথীরা এ পাপের সাথে জড়িত, তাদেরকে ত্যাগ করা কঠিন বলে মনে হয়।

৫. কোন কোন ব্যক্তির নিকট বিশেষ পাপ তার মান সম্মানের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় তার সঙ্গী সাথীদের মাঝে। এজন্য সে চিন্তা করে যেন তার অবস্থান সে ধরে রাখে এবং এ পাপ অব্যাহত রাখে, যেমনটি ঘটে বিভিন্ন অপরাধ ও সন্ত্রাসী গ্র“পের প্রধানদের বেলায়। যেমনটি ঘটেছিল অশ্লীল কবি আবু নাওয়াসের বেলায়, যখন তাকে কবি আবুল আতাহিয়া উপদেশ দেয় ও ভর্ৎসনা করে তার পাপের জন্য। সে তখন জবাবে লিখে -
হে আতাহিয়া! তুমি কি চাও আমি
ছেড়ে দেই আনন্দ ফূর্তি করা
তুমি কি চাও আমি ধর্মকর্ম করে হারিয়ে ফেলি
আমার লোকদের কাছে আমার মর্যাদা।

[তিন]: যার জন্য তাওবার প্রয়োজন সে যেন তাড়াতাড়ি তাওবা করে। কারণ তাওবা করতে দেরী করাটাই পাপ।
[চার]: আল্লাহর হক যা ছুটে গেছে তা যথাসম্ভব আদায় করা। যেমন জাকাত দেয়া যা সে পূর্বে দেয়নি। কেননা এতে আবার দরিদ্র লোকজনের অধিকারও রয়েছে।
[পাঁচ]: পাপের স্থানকে ত্যাগ করা যদি সেখানে অবস্থান করলে আবার সে পাপে জড়িয়ে পড়ার আশংকা থাকে।
[ছয়]: যারা পাপ কাজে সহযোগিতা করে তাদেরকে পরিত্যাগ করা (এটিও পূর্ববর্তী ১০০টি লোক হত্যাকারীর হাদীস থেকে গ্রহণ করা হয়েছে।)
মহান আল্লাহ বলেন:

“আন্তরিক বন্ধুরাই সেদিন একে অপরের শত্রুতে পরিণত হবে, মুত্তাকীরা ছাড়া।” (সূরা আল-যুখরুফ: ৬৭)

খারাপ সাথীরা একে অপরকে কিয়ামতের দিন অভিশাপ দিবে। এজন্য হে তাওবাকারী, আপনাকে এদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে ও এদের থেকে সতর্ক থাকতে হবে, যদি আপনি তাদেরকে দাওয়াত দিতে অপারগ হন। শয়তান যেন আপনার ঘাড়ে আবার সওয়ার হবার সুযোগ না পায় এবং আপনাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে আবার কুপথে নিয়ে না যায়। আর আপনি তো জানেন যে, আপনি দুর্বল তাকে প্রতিরোধ করতে সক্ষম হবেন না। এ ধরণের অনেক ঘটনা রয়েছে যে, অনেক লোকই তার পুরাতন বন্ধু বান্ধবের সাথে সম্পর্কিত হওয়ার পর আবার পাপে জড়িয়ে পড়েছে।
[সাত]: নিজের কাছে রক্ষিত হারাম জিনিসকে নষ্ট করে ফেলা। যেমন মাদক দ্রব্য, বাদ্যযন্ত্র, যেমন একতারা, হারমনিয়াম, অথবা ছবি, ব্লু ফ্লিম, অশ্লীল নভেল নাটক। এগুলো নষ্ট করে ফেলতে হবে অথবা পুড়িয়ে ফেলতে হবে। তাওবাকারীকে সঠিক পথে দৃঢ়ভাবে থাকার জন্য অবশ্যই সব জাহেলিয়াতের জিনিস থেকে মুক্ত হতে হবে। এ ধরণের অনেক ঘটনা রয়েছে, যাতে দেখা যায়, এসব হারাম জিনিসই তাওবাকারীর পূর্বের অবস্থানে ফিরে যাবার পিছনে প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এর দ্বারাই সে পথভ্রষ্ট হয়েছে। আমরা আল্লাহর নিকট সঠিক পথে টিকে থাকার জন্য তাওফীক কামনা করছি।
[আট]: ভাল সঙ্গী-সাথী গ্রহণ করতে হবে যারা তাকে দ্বীনের ব্যাপারে সহায়তা করবে এবং এরা হবে খারাপ সঙ্গী সাথীর বিকল্প। আর চেষ্টা করতে হবে বিভিন্ন ধর্মীয় ও ইলমী আলোচনায় বসার জন্য। নিজেকে সব সময় এমন কাজে মশগুল রাখতে হবে যাতে কল্যাণ রয়েছে, যেন শয়তান তাকে পূর্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেবার সুযোগ না পায়।
[নয়]: নিজ শরীরের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে যাকে সে হারাম দিয়ে প্রতিপালন করেছে। একে আল্লাহর আনুগত্যের কাজে লাগাতে হবে এবং হালাল রুজি খেতে হবে যেন শরীরে আবার পবিত্র রক্ত-মাংস সৃষ্টি হয়।
[দশ]: তাওবা দম আটকে যাওয়া বা ফুরিয়ে যাবার (মৃত্যুর পূর্বক্ষণে শ্বাসকষ্ট শুরু হবার) পূর্বে এবং পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হবার পূর্বে হতে হবে। ঘড়ঘড়ার অর্থ হলো কণ্ঠনালী হতে এমন শব্দ বের হওয়া যা মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে হয়ে থাকে। এর উদ্দেশ্য হলো কিয়ামতের পূর্বেই তাওবা করতে হবে তা ছোট কিয়ামত হোক (মৃত্যু) বা বড় কিয়ামতই হোক (পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হওয়া)।
কেননা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি আল্লাহর নিকট তাওবা করবে ঘড়ঘড়া উঠার পূর্বে, আল্লাহ তার তাওবা কবুল করবেন।” (আহমাদ, তিরমিযী, সহীহ আল জামে’ : ৬১৩২)
Source: সরলপথ

আমি তাওবা করতে চাই কিন্তু! পর্ব-৩ – তাওবার শর্ত ও এর পরিপূরক বিষয়

শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু

তাওবা শব্দটি এক মহান শব্দ। এর অর্থ খুবই গভীর। এমন নয় যা অনেকেই মনে করে থাকেন, মুখে শব্দটি বললাম অতঃপর গুনাহে লিপ্ত থাকলাম। আপনি আল্লাহর নিম্নোক্ত বাণী অনুধাবন করে দেখুন। আল্লাহ্ কি বলছেন:

“তোমরা তোমাদের প্রভূর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। অতঃপর তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন (তাওবা) কর।” (সূরা হুদ: ৩)
আয়াতের মধ্যে সকলকে ক্ষমা চাইতে বলা হয়েছে, অতঃপর তাওবা করতে বলা হয়েছে। সুতরাং তাওবা হচ্ছে ক্ষমা প্রার্থনার পর অতিরিক্ত আলাদা বিষয়।
কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের জন্য অবশ্যই কিছু শর্ত থাকে। আলেম-ওলামাগণ কুরআন ও হাদীস মন্থন করে তাওবার জন্য কতিপয় শর্ত উল্লেখ করেছেন, তা হলো:

এক: দ্রুত পাপ থেকে বিরত হওয়া।

দুই: পূর্বে যা ঘটে গেছে সে জন্য অনুতপ্ত হওয়া।

তিন: পুনরায় পাপ কাজে ফিরে না আসার জন্য দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করা।

চার: প্রাপকদের হক ফিরিয়ে দেয়া যা অন্যায়ভাবে নেয়া হয়েছিল অথবা তাদের নিকট থেকে মাফ চেয়ে নেওয়া।
আর খালেসভাবে তাওবার জন্য কতিপয় আলেম যেসব শর্ত উল্লেখ করেছেন, নিম্নে সেগুলো উদাহরণসহ আলোচনা করা হচ্ছে।

[এক]: শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য পাপ ত্যাগ করা, অন্য কোন কারণে নয়, যেমন;
অক্ষমতার কারণে পাপ থেকে দূরে থাকা, এসব কর্ম করতে ভাল না লাগা অথবা লোকজন মন্দ বলবে এই ভয়ে পাপ ত্যাগ করা।
এজন্য তাকে তাওবাকারী বলা হবে না, যে ব্যক্তি পাপ ত্যাগ করেছে তার মানহানী ঘটায় বা এর জন্য হয়তো সে চাকুরীচ্যুত বা পদবী হারাতে পারে।
তাকে তাওবাকারী বলা যাবে না, যে ব্যক্তি পাপ ত্যাগ করল তার শক্তি ও স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য। যেমন; কেউ জেনা করা ত্যাগ করলো যেন দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে বাঁচতে পারে অথবা তার শরীর ও স্মৃতি শক্তিকে দুর্বল না করে।

তেমনিভাবে তাকে তাওবাকারী বলা যাবে না, যে ব্যক্তি চুরি করা ছেড়ে দিয়েছে; কোন বাড়ীতে ঢুকার পথ না পেয়ে বা সিন্দুক খুলতে অসমর্থ কিংবা পাহারাদার ও পুলিশের ভয়ে।
তাকে তাওবাকারী বলা যাবে না, যে দূর্নীতি দমন বিভাগের লোকজনদের জোর তৎপরতায় ধরা পড়ার ভয়ে ঘুষ খাওয়া বন্দ রেখেছে।

আর তাকেও তাওবাকারী বলা যাবে না, যে ব্যক্তি মদ পান, মাদকদ্রব্য বা হেরোইন সেবন ইত্যাদি ছেড়ে দিয়েছে দারিদ্রের কারণে।
তেমনিভাবে তাকেও তাওবাকারী বলা যাবে না, যে সামর্থহীন হওয়ার কারণে গুনাহ করা ছেড়ে দিলো। যেমন মিথ্যা বলা ছেড়ে দিয়েছে তার কথায় জড়তা সৃষ্টি হওয়ার কারণে কিংবা জেনা করছে না যেহেতু সে সহবাস ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে, কিংবা চুরি করা ছেড়ে দিয়েছে আহত হয়ে পঙ্গু হয়ে পড়ার কারণে।
বরং এসবে অবশ্যই অনুতপ্ত হতে হবে, সব ধরনের পাপ থেকে মুক্ত হতে হবে এবং অতীত কর্মকান্ডের জন্য লজ্জিত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।

এ জন্যেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “অনুতপ্ত হওয়াই হলো তাওবা।”(আহমাদ, ইবনে মাজা, সহীহ আল-জামে ৬৮০২)
মহান আল্লাহ আকাংখা পোষণকারী অপারগকে কর্ম সম্পাদনকারীর মর্যাদায় ভূষিত করেছেন। আপনি জানেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি বলেছেন:
“দুনিয়া চার প্রকার লোকের জন্য;
(১) সেই বান্দার জন্য যাকে আল্লাহ মাল ও জ্ঞান দান করেছেন সুতরাং সে এতে তার প্রভূকে ভয় করছে, তার আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক রাখছে এবং তার ব্যাপারে আল্লাহর হক জানছে, এ হলো সর্বোত্তম অবস্থানে।
(২) সেই বান্দা যাকে আল্লাহ জ্ঞান দান করেছেন কিন্তু মাল দেননি, সে হলো সঠিক নিয়তের লোক, সে বলে, যদি আমার টাকা পয়সা থাকতো তাহলে উমুক ব্যাক্তির মত কাজ করতাম। সে তার নিয়ত অনুযায়ী সওয়াব পাবে। এদের দুজনের নেকী সমান হবে।
(৩) আর সেই বান্দা যাকে আল্লাহ টাকা পয়সা দিয়েছেন কিন্তু জ্ঞান দান করেননি। সে না জেনেই তার টাকা পয়সা খরচ করছে। এতে সে আল্লাহকে ভয় করে না, আত্মীয়তা রক্ষা করে না এবং এতে আল্লাহর হকও সে জানে না। সে হলো সর্ব নিকৃষ্ট অবস্থানে।
(৪) আর সেই বান্দা যাকে আল্লাহ মালও দেননি জ্ঞানও দেননি, সে বলে আমার টাকা পয়সা থাকলে উমুকের মতই (খারাপ কাজ) করতাম। সে তার নিয়ত অনুযায়ী প্রতিদান পাবে। এরা দুজনই গুনাহর দিক থেকে সমান। (আহমদ, তিরমিযী, সহীহুত তারগীব ওয়াত তারহীব: ১/৯)
[দুই]: পাপের কদর্যতা ও ভয়াবহতা অনুভব করা; অর্থাৎ সঠিক তাওবার সাথে কখনো আনন্দ ও মজা পাওয়া যাবেনা অতীত পাপের কথা স্মরণ হলে অথবা কখনো ভবিষ্যতে সেসব কাজে ফিরে যাবে, এ কামনা মনে স্থান পাবে না।
ইবনুল কাইয়্যেম রহমতুল্লাহ আলাইহে তার লিখা [الداء والدواء] ‘রোগ ও চিকিৎসা’ এবং [الفوائد] ‘আল্ফাওয়াইদ’ নামক গ্রন্থে গুনাহের অনেক ক্ষতির কথা উল্লেখ করেছেন। তন্মধ্যে: জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হওয়া, অন্তরে একাকিত্ব অনুভব করা, কাজকর্ম কঠিন হয়ে যাওয়া, শরীর দুর্বল হয়ে যাওয়া, আল্লাহর আনুগত্য থেকে বঞ্চিত হওয়া, বরকত কমে যাওয়া, কাজে সমন্বয় না হওয়া, গুনাহর কাজে অভ্যস্থ হয়ে যাওয়া, আল্লাহর ব্যাপারে পাপীর অনাসক্তি সৃষ্টি হয় এবং লোকজন তাকে অশ্রদ্ধা করে, জীবজন্তু তাকে অভিশাপ দেয়, সে সর্বদা অপমানিত হতে থাকে, অন্তরে মোহর পড়ে যায়, লানতের মাঝে পড়ে এবং দু’আ কবুল হয় না, জলে ও স্থলে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়, আত্মমর্যাদাবোধ কমে যায়, লজ্জা চলে যায়, নিয়ামত দূর হয়ে যায়, আজাব নেমে আসে, পাপীর অন্তরে সর্বদা ভয় নেমে আসে এবং সে শয়তানের দোসরে পরিণত হয়, তার জীবন সমাপ্ত হয় মন্দের উপর এবং পরকালীন আজাবে নিপতিত হয়।
পাপের এই ক্ষতি ও বিপর্যয় যদি বান্দা জানতে পারে তাহলে সে পাপ থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকবে। কিছু কিছু লোক এক পাপ ছেড়ে আরেক পাপ করতে শুরু করে তার কিছু কারণ হলো:
১. মনে করে যে, এর পাপ কিছুটা হালকা।
২. মন পাপের দিকে বেশী আকৃষ্ট হয় এবং এর দিকে ঝোক খুবই প্রবল থাকে।
৩. এ পাপ করার জন্য পারিপার্শিক অবস্থা সহজ ও সহায়ক হয় অন্যটির তুলনায়, অন্য পাপের মোকাবেলায় যার জন্য অনেক কিছু জোগাড় করা লাগে।
৪. তার সঙ্গী সাথীরা এ পাপের সাথে জড়িত, তাদেরকে ত্যাগ করা কঠিন বলে মনে হয়।

৫. কোন কোন ব্যক্তির নিকট বিশেষ পাপ তার মান সম্মানের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় তার সঙ্গী সাথীদের মাঝে। এজন্য সে চিন্তা করে যেন তার অবস্থান সে ধরে রাখে এবং এ পাপ অব্যাহত রাখে, যেমনটি ঘটে বিভিন্ন অপরাধ ও সন্ত্রাসী গ্র“পের প্রধানদের বেলায়। যেমনটি ঘটেছিল অশ্লীল কবি আবু নাওয়াসের বেলায়, যখন তাকে কবি আবুল আতাহিয়া উপদেশ দেয় ও ভর্ৎসনা করে তার পাপের জন্য। সে তখন জবাবে লিখে -
হে আতাহিয়া! তুমি কি চাও আমি
ছেড়ে দেই আনন্দ ফূর্তি করা
তুমি কি চাও আমি ধর্মকর্ম করে হারিয়ে ফেলি
আমার লোকদের কাছে আমার মর্যাদা।

[তিন]: যার জন্য তাওবার প্রয়োজন সে যেন তাড়াতাড়ি তাওবা করে। কারণ তাওবা করতে দেরী করাটাই পাপ।
[চার]: আল্লাহর হক যা ছুটে গেছে তা যথাসম্ভব আদায় করা। যেমন জাকাত দেয়া যা সে পূর্বে দেয়নি। কেননা এতে আবার দরিদ্র লোকজনের অধিকারও রয়েছে।
[পাঁচ]: পাপের স্থানকে ত্যাগ করা যদি সেখানে অবস্থান করলে আবার সে পাপে জড়িয়ে পড়ার আশংকা থাকে।
[ছয়]: যারা পাপ কাজে সহযোগিতা করে তাদেরকে পরিত্যাগ করা (এটিও পূর্ববর্তী ১০০টি লোক হত্যাকারীর হাদীস থেকে গ্রহণ করা হয়েছে।)
মহান আল্লাহ বলেন:

“আন্তরিক বন্ধুরাই সেদিন একে অপরের শত্রুতে পরিণত হবে, মুত্তাকীরা ছাড়া।” (সূরা আল-যুখরুফ: ৬৭)

খারাপ সাথীরা একে অপরকে কিয়ামতের দিন অভিশাপ দিবে। এজন্য হে তাওবাকারী, আপনাকে এদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে ও এদের থেকে সতর্ক থাকতে হবে, যদি আপনি তাদেরকে দাওয়াত দিতে অপারগ হন। শয়তান যেন আপনার ঘাড়ে আবার সওয়ার হবার সুযোগ না পায় এবং আপনাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে আবার কুপথে নিয়ে না যায়। আর আপনি তো জানেন যে, আপনি দুর্বল তাকে প্রতিরোধ করতে সক্ষম হবেন না। এ ধরণের অনেক ঘটনা রয়েছে যে, অনেক লোকই তার পুরাতন বন্ধু বান্ধবের সাথে সম্পর্কিত হওয়ার পর আবার পাপে জড়িয়ে পড়েছে।
[সাত]: নিজের কাছে রক্ষিত হারাম জিনিসকে নষ্ট করে ফেলা। যেমন মাদক দ্রব্য, বাদ্যযন্ত্র, যেমন একতারা, হারমনিয়াম, অথবা ছবি, ব্লু ফ্লিম, অশ্লীল নভেল নাটক। এগুলো নষ্ট করে ফেলতে হবে অথবা পুড়িয়ে ফেলতে হবে। তাওবাকারীকে সঠিক পথে দৃঢ়ভাবে থাকার জন্য অবশ্যই সব জাহেলিয়াতের জিনিস থেকে মুক্ত হতে হবে। এ ধরণের অনেক ঘটনা রয়েছে, যাতে দেখা যায়, এসব হারাম জিনিসই তাওবাকারীর পূর্বের অবস্থানে ফিরে যাবার পিছনে প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এর দ্বারাই সে পথভ্রষ্ট হয়েছে। আমরা আল্লাহর নিকট সঠিক পথে টিকে থাকার জন্য তাওফীক কামনা করছি।
[আট]: ভাল সঙ্গী-সাথী গ্রহণ করতে হবে যারা তাকে দ্বীনের ব্যাপারে সহায়তা করবে এবং এরা হবে খারাপ সঙ্গী সাথীর বিকল্প। আর চেষ্টা করতে হবে বিভিন্ন ধর্মীয় ও ইলমী আলোচনায় বসার জন্য। নিজেকে সব সময় এমন কাজে মশগুল রাখতে হবে যাতে কল্যাণ রয়েছে, যেন শয়তান তাকে পূর্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেবার সুযোগ না পায়।
[নয়]: নিজ শরীরের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে যাকে সে হারাম দিয়ে প্রতিপালন করেছে। একে আল্লাহর আনুগত্যের কাজে লাগাতে হবে এবং হালাল রুজি খেতে হবে যেন শরীরে আবার পবিত্র রক্ত-মাংস সৃষ্টি হয়।
[দশ]: তাওবা দম আটকে যাওয়া বা ফুরিয়ে যাবার (মৃত্যুর পূর্বক্ষণে শ্বাসকষ্ট শুরু হবার) পূর্বে এবং পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হবার পূর্বে হতে হবে। ঘড়ঘড়ার অর্থ হলো কণ্ঠনালী হতে এমন শব্দ বের হওয়া যা মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে হয়ে থাকে। এর উদ্দেশ্য হলো কিয়ামতের পূর্বেই তাওবা করতে হবে তা ছোট কিয়ামত হোক (মৃত্যু) বা বড় কিয়ামতই হোক (পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হওয়া)।
কেননা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি আল্লাহর নিকট তাওবা করবে ঘড়ঘড়া উঠার পূর্বে, আল্লাহ তার তাওবা কবুল করবেন।” (আহমাদ, তিরমিযী, সহীহ আল জামে’ : ৬১৩২)
Source: সরলপথ

আমি তাওবা করতে চাই কিন্তু! পর্ব-৩ – তাওবার শর্ত ও এর পরিপূরক বিষয়

শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু

তাওবা শব্দটি এক মহান শব্দ। এর অর্থ খুবই গভীর। এমন নয় যা অনেকেই মনে করে থাকেন, মুখে শব্দটি বললাম অতঃপর গুনাহে লিপ্ত থাকলাম। আপনি আল্লাহর নিম্নোক্ত বাণী অনুধাবন করে দেখুন। আল্লাহ্ কি বলছেন:

“তোমরা তোমাদের প্রভূর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। অতঃপর তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন (তাওবা) কর।” (সূরা হুদ: ৩)
আয়াতের মধ্যে সকলকে ক্ষমা চাইতে বলা হয়েছে, অতঃপর তাওবা করতে বলা হয়েছে। সুতরাং তাওবা হচ্ছে ক্ষমা প্রার্থনার পর অতিরিক্ত আলাদা বিষয়।
কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের জন্য অবশ্যই কিছু শর্ত থাকে। আলেম-ওলামাগণ কুরআন ও হাদীস মন্থন করে তাওবার জন্য কতিপয় শর্ত উল্লেখ করেছেন, তা হলো:

এক: দ্রুত পাপ থেকে বিরত হওয়া।

দুই: পূর্বে যা ঘটে গেছে সে জন্য অনুতপ্ত হওয়া।

তিন: পুনরায় পাপ কাজে ফিরে না আসার জন্য দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করা।

চার: প্রাপকদের হক ফিরিয়ে দেয়া যা অন্যায়ভাবে নেয়া হয়েছিল অথবা তাদের নিকট থেকে মাফ চেয়ে নেওয়া।
আর খালেসভাবে তাওবার জন্য কতিপয় আলেম যেসব শর্ত উল্লেখ করেছেন, নিম্নে সেগুলো উদাহরণসহ আলোচনা করা হচ্ছে।

[এক]: শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য পাপ ত্যাগ করা, অন্য কোন কারণে নয়, যেমন;
অক্ষমতার কারণে পাপ থেকে দূরে থাকা, এসব কর্ম করতে ভাল না লাগা অথবা লোকজন মন্দ বলবে এই ভয়ে পাপ ত্যাগ করা।
এজন্য তাকে তাওবাকারী বলা হবে না, যে ব্যক্তি পাপ ত্যাগ করেছে তার মানহানী ঘটায় বা এর জন্য হয়তো সে চাকুরীচ্যুত বা পদবী হারাতে পারে।
তাকে তাওবাকারী বলা যাবে না, যে ব্যক্তি পাপ ত্যাগ করল তার শক্তি ও স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য। যেমন; কেউ জেনা করা ত্যাগ করলো যেন দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে বাঁচতে পারে অথবা তার শরীর ও স্মৃতি শক্তিকে দুর্বল না করে।

তেমনিভাবে তাকে তাওবাকারী বলা যাবে না, যে ব্যক্তি চুরি করা ছেড়ে দিয়েছে; কোন বাড়ীতে ঢুকার পথ না পেয়ে বা সিন্দুক খুলতে অসমর্থ কিংবা পাহারাদার ও পুলিশের ভয়ে।
তাকে তাওবাকারী বলা যাবে না, যে দূর্নীতি দমন বিভাগের লোকজনদের জোর তৎপরতায় ধরা পড়ার ভয়ে ঘুষ খাওয়া বন্দ রেখেছে।

আর তাকেও তাওবাকারী বলা যাবে না, যে ব্যক্তি মদ পান, মাদকদ্রব্য বা হেরোইন সেবন ইত্যাদি ছেড়ে দিয়েছে দারিদ্রের কারণে।
তেমনিভাবে তাকেও তাওবাকারী বলা যাবে না, যে সামর্থহীন হওয়ার কারণে গুনাহ করা ছেড়ে দিলো। যেমন মিথ্যা বলা ছেড়ে দিয়েছে তার কথায় জড়তা সৃষ্টি হওয়ার কারণে কিংবা জেনা করছে না যেহেতু সে সহবাস ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে, কিংবা চুরি করা ছেড়ে দিয়েছে আহত হয়ে পঙ্গু হয়ে পড়ার কারণে।
বরং এসবে অবশ্যই অনুতপ্ত হতে হবে, সব ধরনের পাপ থেকে মুক্ত হতে হবে এবং অতীত কর্মকান্ডের জন্য লজ্জিত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।

এ জন্যেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “অনুতপ্ত হওয়াই হলো তাওবা।”(আহমাদ, ইবনে মাজা, সহীহ আল-জামে ৬৮০২)
মহান আল্লাহ আকাংখা পোষণকারী অপারগকে কর্ম সম্পাদনকারীর মর্যাদায় ভূষিত করেছেন। আপনি জানেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি বলেছেন:
“দুনিয়া চার প্রকার লোকের জন্য;
(১) সেই বান্দার জন্য যাকে আল্লাহ মাল ও জ্ঞান দান করেছেন সুতরাং সে এতে তার প্রভূকে ভয় করছে, তার আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক রাখছে এবং তার ব্যাপারে আল্লাহর হক জানছে, এ হলো সর্বোত্তম অবস্থানে।
(২) সেই বান্দা যাকে আল্লাহ জ্ঞান দান করেছেন কিন্তু মাল দেননি, সে হলো সঠিক নিয়তের লোক, সে বলে, যদি আমার টাকা পয়সা থাকতো তাহলে উমুক ব্যাক্তির মত কাজ করতাম। সে তার নিয়ত অনুযায়ী সওয়াব পাবে। এদের দুজনের নেকী সমান হবে।
(৩) আর সেই বান্দা যাকে আল্লাহ টাকা পয়সা দিয়েছেন কিন্তু জ্ঞান দান করেননি। সে না জেনেই তার টাকা পয়সা খরচ করছে। এতে সে আল্লাহকে ভয় করে না, আত্মীয়তা রক্ষা করে না এবং এতে আল্লাহর হকও সে জানে না। সে হলো সর্ব নিকৃষ্ট অবস্থানে।
(৪) আর সেই বান্দা যাকে আল্লাহ মালও দেননি জ্ঞানও দেননি, সে বলে আমার টাকা পয়সা থাকলে উমুকের মতই (খারাপ কাজ) করতাম। সে তার নিয়ত অনুযায়ী প্রতিদান পাবে। এরা দুজনই গুনাহর দিক থেকে সমান। (আহমদ, তিরমিযী, সহীহুত তারগীব ওয়াত তারহীব: ১/৯)
[দুই]: পাপের কদর্যতা ও ভয়াবহতা অনুভব করা; অর্থাৎ সঠিক তাওবার সাথে কখনো আনন্দ ও মজা পাওয়া যাবেনা অতীত পাপের কথা স্মরণ হলে অথবা কখনো ভবিষ্যতে সেসব কাজে ফিরে যাবে, এ কামনা মনে স্থান পাবে না।
ইবনুল কাইয়্যেম রহমতুল্লাহ আলাইহে তার লিখা [الداء والدواء] ‘রোগ ও চিকিৎসা’ এবং [الفوائد] ‘আল্ফাওয়াইদ’ নামক গ্রন্থে গুনাহের অনেক ক্ষতির কথা উল্লেখ করেছেন। তন্মধ্যে: জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হওয়া, অন্তরে একাকিত্ব অনুভব করা, কাজকর্ম কঠিন হয়ে যাওয়া, শরীর দুর্বল হয়ে যাওয়া, আল্লাহর আনুগত্য থেকে বঞ্চিত হওয়া, বরকত কমে যাওয়া, কাজে সমন্বয় না হওয়া, গুনাহর কাজে অভ্যস্থ হয়ে যাওয়া, আল্লাহর ব্যাপারে পাপীর অনাসক্তি সৃষ্টি হয় এবং লোকজন তাকে অশ্রদ্ধা করে, জীবজন্তু তাকে অভিশাপ দেয়, সে সর্বদা অপমানিত হতে থাকে, অন্তরে মোহর পড়ে যায়, লানতের মাঝে পড়ে এবং দু’আ কবুল হয় না, জলে ও স্থলে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়, আত্মমর্যাদাবোধ কমে যায়, লজ্জা চলে যায়, নিয়ামত দূর হয়ে যায়, আজাব নেমে আসে, পাপীর অন্তরে সর্বদা ভয় নেমে আসে এবং সে শয়তানের দোসরে পরিণত হয়, তার জীবন সমাপ্ত হয় মন্দের উপর এবং পরকালীন আজাবে নিপতিত হয়।
পাপের এই ক্ষতি ও বিপর্যয় যদি বান্দা জানতে পারে তাহলে সে পাপ থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকবে। কিছু কিছু লোক এক পাপ ছেড়ে আরেক পাপ করতে শুরু করে তার কিছু কারণ হলো:
১. মনে করে যে, এর পাপ কিছুটা হালকা।
২. মন পাপের দিকে বেশী আকৃষ্ট হয় এবং এর দিকে ঝোক খুবই প্রবল থাকে।
৩. এ পাপ করার জন্য পারিপার্শিক অবস্থা সহজ ও সহায়ক হয় অন্যটির তুলনায়, অন্য পাপের মোকাবেলায় যার জন্য অনেক কিছু জোগাড় করা লাগে।
৪. তার সঙ্গী সাথীরা এ পাপের সাথে জড়িত, তাদেরকে ত্যাগ করা কঠিন বলে মনে হয়।

৫. কোন কোন ব্যক্তির নিকট বিশেষ পাপ তার মান সম্মানের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় তার সঙ্গী সাথীদের মাঝে। এজন্য সে চিন্তা করে যেন তার অবস্থান সে ধরে রাখে এবং এ পাপ অব্যাহত রাখে, যেমনটি ঘটে বিভিন্ন অপরাধ ও সন্ত্রাসী গ্র“পের প্রধানদের বেলায়। যেমনটি ঘটেছিল অশ্লীল কবি আবু নাওয়াসের বেলায়, যখন তাকে কবি আবুল আতাহিয়া উপদেশ দেয় ও ভর্ৎসনা করে তার পাপের জন্য। সে তখন জবাবে লিখে -
হে আতাহিয়া! তুমি কি চাও আমি
ছেড়ে দেই আনন্দ ফূর্তি করা
তুমি কি চাও আমি ধর্মকর্ম করে হারিয়ে ফেলি
আমার লোকদের কাছে আমার মর্যাদা।

[তিন]: যার জন্য তাওবার প্রয়োজন সে যেন তাড়াতাড়ি তাওবা করে। কারণ তাওবা করতে দেরী করাটাই পাপ।
[চার]: আল্লাহর হক যা ছুটে গেছে তা যথাসম্ভব আদায় করা। যেমন জাকাত দেয়া যা সে পূর্বে দেয়নি। কেননা এতে আবার দরিদ্র লোকজনের অধিকারও রয়েছে।
[পাঁচ]: পাপের স্থানকে ত্যাগ করা যদি সেখানে অবস্থান করলে আবার সে পাপে জড়িয়ে পড়ার আশংকা থাকে।
[ছয়]: যারা পাপ কাজে সহযোগিতা করে তাদেরকে পরিত্যাগ করা (এটিও পূর্ববর্তী ১০০টি লোক হত্যাকারীর হাদীস থেকে গ্রহণ করা হয়েছে।)
মহান আল্লাহ বলেন:

“আন্তরিক বন্ধুরাই সেদিন একে অপরের শত্রুতে পরিণত হবে, মুত্তাকীরা ছাড়া।” (সূরা আল-যুখরুফ: ৬৭)

খারাপ সাথীরা একে অপরকে কিয়ামতের দিন অভিশাপ দিবে। এজন্য হে তাওবাকারী, আপনাকে এদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে ও এদের থেকে সতর্ক থাকতে হবে, যদি আপনি তাদেরকে দাওয়াত দিতে অপারগ হন। শয়তান যেন আপনার ঘাড়ে আবার সওয়ার হবার সুযোগ না পায় এবং আপনাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে আবার কুপথে নিয়ে না যায়। আর আপনি তো জানেন যে, আপনি দুর্বল তাকে প্রতিরোধ করতে সক্ষম হবেন না। এ ধরণের অনেক ঘটনা রয়েছে যে, অনেক লোকই তার পুরাতন বন্ধু বান্ধবের সাথে সম্পর্কিত হওয়ার পর আবার পাপে জড়িয়ে পড়েছে।
[সাত]: নিজের কাছে রক্ষিত হারাম জিনিসকে নষ্ট করে ফেলা। যেমন মাদক দ্রব্য, বাদ্যযন্ত্র, যেমন একতারা, হারমনিয়াম, অথবা ছবি, ব্লু ফ্লিম, অশ্লীল নভেল নাটক। এগুলো নষ্ট করে ফেলতে হবে অথবা পুড়িয়ে ফেলতে হবে। তাওবাকারীকে সঠিক পথে দৃঢ়ভাবে থাকার জন্য অবশ্যই সব জাহেলিয়াতের জিনিস থেকে মুক্ত হতে হবে। এ ধরণের অনেক ঘটনা রয়েছে, যাতে দেখা যায়, এসব হারাম জিনিসই তাওবাকারীর পূর্বের অবস্থানে ফিরে যাবার পিছনে প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এর দ্বারাই সে পথভ্রষ্ট হয়েছে। আমরা আল্লাহর নিকট সঠিক পথে টিকে থাকার জন্য তাওফীক কামনা করছি।
[আট]: ভাল সঙ্গী-সাথী গ্রহণ করতে হবে যারা তাকে দ্বীনের ব্যাপারে সহায়তা করবে এবং এরা হবে খারাপ সঙ্গী সাথীর বিকল্প। আর চেষ্টা করতে হবে বিভিন্ন ধর্মীয় ও ইলমী আলোচনায় বসার জন্য। নিজেকে সব সময় এমন কাজে মশগুল রাখতে হবে যাতে কল্যাণ রয়েছে, যেন শয়তান তাকে পূর্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেবার সুযোগ না পায়।
[নয়]: নিজ শরীরের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে যাকে সে হারাম দিয়ে প্রতিপালন করেছে। একে আল্লাহর আনুগত্যের কাজে লাগাতে হবে এবং হালাল রুজি খেতে হবে যেন শরীরে আবার পবিত্র রক্ত-মাংস সৃষ্টি হয়।
[দশ]: তাওবা দম আটকে যাওয়া বা ফুরিয়ে যাবার (মৃত্যুর পূর্বক্ষণে শ্বাসকষ্ট শুরু হবার) পূর্বে এবং পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হবার পূর্বে হতে হবে। ঘড়ঘড়ার অর্থ হলো কণ্ঠনালী হতে এমন শব্দ বের হওয়া যা মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে হয়ে থাকে। এর উদ্দেশ্য হলো কিয়ামতের পূর্বেই তাওবা করতে হবে তা ছোট কিয়ামত হোক (মৃত্যু) বা বড় কিয়ামতই হোক (পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হওয়া)।
কেননা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি আল্লাহর নিকট তাওবা করবে ঘড়ঘড়া উঠার পূর্বে, আল্লাহ তার তাওবা কবুল করবেন।” (আহমাদ, তিরমিযী, সহীহ আল জামে’ : ৬১৩২)
Source: সরলপথ

আমি তাওবা করতে চাই কিন্তু! পর্ব-২::: পাপকে তুচ্ছজ্ঞান করার ভয়াবহতা

শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু

পরাক্রমশালী আল্লাহ তার বান্দাদের নির্দেশ দিয়েছেন নিষ্ঠার সাথে তাওবা করার জন্য। তিনি বলেন:
undefined
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর নিকট নিষ্ঠার সাথে তাওবা কর (প্রত্যাবর্তন কর)।’’ (আত তাহরীম: ৮)
কেরামান কাতেবীন (ফেরেশতা) আমাদের কারো গুনাহ্ লিখার পূর্বে আল্লাহ আমাদেরকে তাওবার ব্যাপারে অনেক ঢিল দিয়েছেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: নিশ্চয় বামপাশের ফেরেশতা কলম উঠিয়ে রাখে ছয় ঘন্টা পর্যন্ত ভূলকারী মুসলিম বান্দা থেকে। বান্দা যদি অনুতপ্ত হয় এবং আল্লাহর নিকট ক্ষমা চায় তাহলে তা মাফ করে দেয়া হয়, নতুবা একটি গুনাহ লিখা হয়। (তাবারানী, বায়হাকী, ইমাম আলবানী হাদীসটিকে হাসান বলে অভিহিত করেছেন) আরেকটি ফুরসত হলো লিখার পরে এবং মৃত্যু উপস্থিত হওয়ার পূর্বে।
বর্তমান যুগের সমস্যা হলো অনেক মানুষই আল্লাহকে ভয় করে না, তারা রাতদিন বিভিন্ন রকমের গুনাহ করে চলেছে। এদের কেউ কেউ আবার গুনাহকে তুচ্ছজ্ঞান করে। এজন্য দেখবেন এদের কেউ কেউ সগীরা গুনাহকে খুবই তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে দেখে থাকে।
যেমন বলে, একবার খারাপ কিছু দেখলে অথবা কোন বেগানা মহিলার সাথে করমর্দন করলে কি-ই বা ক্ষতি হবে?
অনেকেই আগ্রহ ভরে হারাম জিনিসের দিকে নজর দেয় পত্র-পত্রিকায় বা টিভি সিরিয়াল বা সিনেমার দিকে, এমনকি এদের কেউ কেউ যখন জানতে পারে যে এটি হারাম, তখন খুবই রসিকতা করে প্রশ্ন করে, এতে কত গুনাহ রয়েছে? এটি কি কবীরা গুনাহ না সগীরা গুনাহ? আপনি যখন এটির বাস্তব অবস্থা জানবেন তখন তুলনা করে দেখুন নিমোক্ত দুটি বর্ণনার সাথে যা ইমাম বুখারী উল্লেখ করেছেন:
এক: হযরত আনাস রাযিআল্লাহু তা’আলা আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, তোমরা এমন সব কাজ কর যা তোমাদের দৃষ্টিতে চুলের চেয়েও সূক্ষ্ম। কিন্তু আমরা রাসূলুল্লাহর যুগে এগুলোকে মনে করতাম ধ্বংসকারী।
দুই: হযরত ইবনে মাসউদ রাযিআল্লাহু তা’আলা আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একজন মুমিন গুনাহকে এভাবে দেখে থাকে যে, সে যেন এক পাহাড়ের নিচে বসে আছে যা তার মাথার উপর ভেঙ্গে পড়বে। পক্ষান্তরে পাপী তার গুনাহকে দেখে যেন মাছি তার নাকের ডগায় বসেছে, তাকে এভাবে তাড়িয়ে দেয়।
এরা কি বিষয়টির বিপজ্জনকতা উপলব্ধি করতে পারবে যখন তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই হাদীস পাঠ করবে ;

“তোমরা নগণ্য ছোট ছোট গুনাহ থেকে সাবধান হও! নগণ্য ছোট ছোট গুনাহগুলোর উদাহরণ হল ঐ লোকদের মত যারা কোন মাঠে বা প্রান্তরে গিয়ে অবস্থান করল এবং তাদের প্রত্যেকেই কিছু কিছু করে লাকড়ি (জ্বালানি কাঠ) সংগ্রহ করে নিয়ে এলো। শেষ পর্যন্ত এতটা লাকড়ি তারা সংগ্রহ করল যা দিয়ে তাদের খাবার পাকানো হল। নিশ্চয় নগণ্য ছোট ছোট গুনাহতে লিপ্ত থাকা ব্যক্তিদেরকে যখন সেই নগণ্য ছোট ছোট গুনাহগুলো গ্রাস করবে (পাকড়াও করবে) তখন তাদেরকে ধ্বংস করে ফেলবে।” অন্য এক বর্ণনায় এসেছে যে, “তোমরা নগণ্য ছোট ছোট গুনাহ থেকে সাবধান হও; কেননা সেগুলো মানুষের কাঁধে জমা হতে থাকে অতঃপর তাকে ধ্বংস করে দেয়।” (আহমদ, সহীহ আল-জামে’ ২৬৮৬-২৬৮৭)
বিদ্বানগণ উল্লেখ করেছেন: যখন সগীরা গুনাহর সাথে লজ্জাশরম কমে যাবে, কোন কিছুতে ভ্রুক্ষেপ করবে না, খোদাভীতি থাকবে না এবং আল্লাহর ব্যাপারে ভক্তি হবে না তখন একে কবীরা গুনাহতে পরিণত করবে। এজন্যই বলা হয়েছে যে, ক্রমাগত পাপ করলে তা আর সগীরা থাকে না এবং ক্ষমা প্রার্থনা করলে কবীরা থাকে না। অর্থাৎ ক্রমাগতভাবে সগীরা গুনাহ করতে থাকলে তা কবীরা গুনাহে পরিণত হয় এবং ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকলে কবীরা গুনাহ আর থাকে না তা মাফ হয়ে যায়। যার এ অবস্থা তাকে আমরা বলি, গুনাহ ছোট আপনি এদিকে দৃষ্টি দিবেন না, বরং আপনি দৃষ্টি দিবেন এদিকে যে, আপনি কার অবাধ্যতা করছেন।
আমার এ কথাগুলো দ্বারা অবশ্যই উপকৃত হবেন ইনশাআল্লাহ সত্যবাদীগণ, যারা অনুভব করছেন তাদের গুনাহ ঘাটতির ব্যাপারটি। তারা নয় যারা তাদের গোমরাহীতে অনড়, তাদের বাতিল অবস্থার প্রতি অবিচল। এটি তাদের জন্য যারা বিশ্বাস করে মহান আল্লাহর এ বাণীকে:
“আপনি আমার বান্দাদের জানিয়ে দিন যে, নিশ্চয় আমিই একমাত্র ক্ষমাকারী দয়ালু ”। (সূরা আল হিজর: ৪৯)
তেমনি যারা ঈমান রাখে এ বাণীর উপর:
“আর নিশ্চয়ই আমার শাস্তি হলো যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।” (সূরা আল হিজর: ৫০)
Source: সরলপথ

আমি তাওবা করতে চাই কিন্তু! পর্ব-১

শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু

undefinedসমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য। আমরা তাঁর প্রশংসা করছি এবং তাঁরই কাছে সাহায্য চাচ্ছি। আল্লাহ তা’আলা যাকে হেদায়াত দান করেন তাকে কেউ পথভ্রষ্ট করতে পারেনা। আর তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করেন তাকে কেউ পথ দেখাতে পারে না। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন সত্য ইলাহ নেই। তিনি একক এবং তাঁর কোন শরীক নেই এবং আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল। অতঃপর: মহান আল্লাহ সমস্ত মুমিনদেরকে তাওবা করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন:

হে মুমিনগণ! তোমরা সকলে আল্লাহর পানে তাওবা (প্রত্যাবর্তন) কর, নিশ্চয় তোমরা সফলকাম হবে।” (আননূর: ৩১)

তিনি তাঁর বান্দাদেরকে তাওবাকারী ও অত্যাচারী হিসেবে ভাগ করেছেন। এখানে তৃতীয় কোন ভাগ নেই। মহান আল্লাহ বলেন:
যারা তাওবা করবে না, তারাই অত্যাচারী।” (আলহুজুরাত: ১১)
আর এখন এমন এক সময় এসেছে যাতে মানুষ আল্লাহর দ্বীন থেকে দূরে সরে গেছে এবং পাপাচার ব্যাপকতা লাভ করছে ও বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে। অবস্থা এমন হয়েছে যে, এ থেকে কেউই বাঁচতে পারছে না আল্লাহর বিশেষ রহমত ছাড়া।
আল্লাহর বিশেষ ইচ্ছা এই যে, তিনি তাঁর নূরকে অবশ্যই পূর্ণতা দান করবেন, যার ফলে অনেক লোকই তাদের গাফলতী ও তন্দ্রা থেকে জেগে উঠেছে। তারা বুঝতে পেরেছে যে, তারা আল্লাহর হকের ব্যাপারে কার্পণ্য করেছে, তার অবাধ্যতার জন্য অনুতপ্ত, যার ফলে তারা তাওবার দিকে এগিয়ে এসেছে। অন্যরা এই বিষাক্ত জীবনের ব্যাপারে বিতশ্রদ্ধ হয়ে উঠেছে। তারা পথ খুঁজছে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের হয়ে আসার জন্য। কিন্তু তাদের সামনে বাধা হয়ে উঠেছে কিছু প্রতিবন্ধকতা যা তাদের মাঝে ও তাওবার মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এসব প্রতিবন্ধকতার মধ্যে কিছু হলো মনের মধ্যে, আর কিছু হলো তার চতুর্পাশে। আমি এ পুস্তিকা রচনা করেছি এ আশা করে যে, এসব বিষয় পরিষ্কার করা ও এর হুকুম স্পষ্ট করে বর্ণনা করার লক্ষ্যে এবং শয়তানকে বিতাড়িত করার উদ্দেশ্যে।
এ নিবন্ধে একটি ভূমিকা থাকবে গুনাহকে তুচ্ছজ্ঞান করার ভয়াবহতা সম্পর্কে, এরপর তাওবার শর্তাবলীর ব্যাখ্যা ও তার মানসিক চিকিৎসা সম্পর্কে। এরপর থাকবে তাওবা সম্পর্কে ফাত্ওয়া, দলীল প্রমাণসহ কুরআন, হাদীস এবং আহলুল ইলমের অভিমত। পরিশেষে থাকবে একটি উপসংহার। আল্লাহর নিকট দু’আ করি, তিনি যেন আমাকে এবং আমার ভাই-বোনদেরকে এ থেকে নসিহত ও উত্তম দাওয়াত গ্রহণ করার তাওফীক দান করেন এবং আমাদের সকলের তাওবা কবুল করেন।

Friday, February 22, 2013

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্‌”র ক্ষমতা

শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু

লেখকঃ শেইখ সলীহ্‌ ইবন্‌ ফাওযান আল–ফাওযান 
অনুবাদ ও সম্পাদনাঃ আবদ্‌ আল-আহাদ | ওয়েব এডিটিং: শাবাব শাহরিয়ার খান

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্‌

অর্থাৎ, আল্লাহ্‌ ছাড়া ইবাদতের যোগ্য অন্য কোন সত্য ইলাহ্‌ নেই। এই কথা যদি কেউ সত্যতার সাথে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে উচ্চারন করে, এ কথার অর্থ যা বলে সে অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করে, বিশ্বাস এবং চালচলনে এই কথাকে বাস্তবিক রূপদান করে তাহলে ব্যক্তি ও সমাজ উভয় জীবনেই একথার প্রভাব আসলেই চমৎকার এবং প্রশংসনীয়।

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্‌ এর তিনটি উল্লেখযোগ্য ক্ষমতাঃ


[১] গোটা মুসলিম উম্মাহ্‌কে একত্রীকরণঃ

একথা গোটা মুসলিম উম্মাহ্‌কে ঈমানের শক্তিতে বলীয়ান করবে। ফলে তারা বাতিল শক্তি তথা তাদের শত্রুদের বিপক্ষে সংগ্রামে বিজয়ী হবে। আর এটা তখনই সম্ভব যখন আমরা সকলেই আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীন কর্তৃক মনোনীত একমাত্র সত্য ধর্ম ইসলামকে অনুসরণ করব, মেনে চলব। যখন আমাদের আকীদাহ্‌ তথা ধর্মীয় বিশ্বাস হবে এক ও অভিন্ন। মহান আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীন বলেনঃ

আর তোমরা একযোগে আল্লাহ্‌র রজ্জুকে সুদৃঢ়রূপে ধারন কর ও বিভক্ত হয়ে যেয়ো না। [সূরা আল ইমরান; ৩:১০৩]

আর তারা যদি তোমাকে প্রতারিত করার ইচ্ছা করে তবে তোমার জন্যে আল্লাহ্‌ই যথেষ্ট, তিনিই তোমাকে স্বীয় সাহায্য দ্বারা এবং মুমিনগণ দ্বারা শক্তিশালী করেছেন। আর তিনি মুমিনদের অন্তরে প্রীতি ও ঐক্য স্থাপন করেছেন, তুমি যদি পৃথিবীর সমুদয় সম্পদও ব্যয় করতে তবুও তাদের অন্তরে প্রীতি, সদ্ভাব ও ঐক্য স্থাপন করতে পারতে না; কিন্তু আল্লাহ্‌ই ওদের পরস্পরের মধ্যে প্রীতি ও সদ্ভাব স্থাপন করে দিয়েছেন, নিঃসন্দেহে তিনি মহাশক্তিমান, মহাকৌশলী। [সূরা আনফাল; ৮:৬২-৬৩]

আকীদাহ্‌ তথা বিশ্বাসগত পার্থক্যের কারনেই মুসলিম উম্মাহ্‌র মধ্যে আজ এতো বিভেদ, অনৈক্য, বিভ্রান্তি আর বিশৃঙ্খলা। একমাত্র এই কারনেই মুসলিম উম্মাহ্‌র ভিতর আজ এতো দ্বন্দ্ব আর হানাহানির সৃষ্টি হয়েছে। মহান আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীন বলেনঃ

নিশ্চয় যারা নিজেদের দ্বীনকে খণ্ড-বিখণ্ড করেছে এবং বিভিন্ন দলে উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে, তাদের সাথে তোমার কোন সম্পর্ক নেই, তাদের বিষয়টি নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌হাওলায় রয়েছে, পরিশেষে তিনি তাদেরকে তাদের কার্যকলাসম্পর্কে অবিহিত করবেন। [সূরা আন’আম; ৬:১৫৯]

কিন্তু তারা নিজেদের মধ্যে তাদের দ্বীনকে বহুভাগে বিভক্ত করেছে; প্রত্যেক দলই তাদের নিকট যা আছে তা নিয়েই আনন্দিত। [সূরা মু’মিনূন; ২৩:৫৩]

আর তাই মানুষ ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃতঅর্থে ঐক্যবদ্ধ হতে পারবেনা যতক্ষণ না তারা ঈমান এবং আকীদাহ্‌ সম্পর্কে যথার্থ এবং বিশুদ্ধ উপলব্ধি অর্জন করতে পেরেছে। এখানেই নিহিত লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্‌ এর তাৎপর্য। একথার তাৎপর্য উপলব্ধি না করে কারোর পক্ষে ঈমান ও আকীদাহ্‌গত পরিশুদ্ধি অর্জন করা সম্ভব নয়। ইসলাম আবির্ভাবের পূর্বে এবং পরে আরবের অবস্থার দিকে দৃষ্টিপাত করলেই বোঝা যায় লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর কী ক্ষমতা।

[২] শান্তি ও নিরাপত্তা অর্জন:

যে সমাজ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্‌ এর শিক্ষায় বিশ্বাসী এবং এর শিক্ষাকে বাস্তবে রূপ দেয় সেই সমাজে বিরাজ করে শুধুই শান্তি ও নিরাপত্তা। এমন সমাজের প্রতিটি মানুষই কেবলমাত্র সেই কাজের ব্যপারে যত্নশীল হবে যা আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীন তাদের জন্য হালাল বা বৈধ ঘোষণা করেছেন। পক্ষান্তরে, তারা সেই সমস্ত কাজ পরিহার করে চলবে যা তিনি হারাম বা অবৈধ ঘোষণা করেছেন। সমাজের প্রতিটি মানুষই তখন তাদের এক ও অভিন্ন আকীদাহ্‌ তথা ধর্মীয় বিশ্বাসকে অনুসরণ করে সকল কাজ-কর্ম সম্পাদন করবে। কারণ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্‌ এর দাবী হল, যে কেউ এই কথার মৌখিক স্বীকৃতি দেবে তাকে এর সত্যতা বাস্তবায়ন করতে হবে কর্মের মাধ্যমে। কর্মহীন মৌখিক ঐ স্বীকৃতি একটি অন্তঃসার শূন্য স্লোগান ছাড়া কিছুই নয়। কাজেই কালিমার শিক্ষায় বিশ্বাসী এবং সেই শিক্ষাকে মেনে চলে এমন সমাজের লোকদেরকে দ্বারা কখনও জুলুম-অত্যাচার, অন্যায়, পারস্পারিক হানাহানি ইত্যাদি সংঘটিত হতে পারেনা। এমন সমাজের লোকেরা গভীর ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে সৎকর্ম সম্পাদনের জন্যে পরস্পরকে সহযোগিতা করবে এবং ভালবাসবে। আর তাদের এই পারস্পারিক সহযোগিতা ও ভালবাসা হবে কেবলমাত্র আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীনের জন্যে, তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে। আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীন বলেনঃ
মুমিনরা তো পরস্পর ভাই-ভাই। [সূরা হুজুরাত; ৪৯:১০]

বিষয়টি অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত সে সব আরবদের জীবনে যারা একসময় ইসলাম মেনে চলত না। অথচ “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্‌” এর পরশে তাদের জীবনে এসেছিল আমূল পরিবর্তন। ইসলাম পূর্ব সময়ে তাদের জীবন ছিল পারস্পারিক মারামারি, কাটাকাটি, হানাহানি, দ্বন্দ্ব-সংঘাত, খুনাখুনি, লুটতরাজ ইত্যাদিতে জর্জরিত। সেই মানুষগুলোই যখন গ্রহণ করল তখন সব কিছু বদলে গেল। যারা রক্তের বদলে রক্ত চাইত তারা ইসলামের কারনেই শান্তি সৌহার্দ আর সম্প্রীতির এক অমায়িক বন্ধনে আবদ্ধ হল। যারা ছিল চরম শত্রু তারাই হল পরম বন্ধু। এই হল ইসলাম তথা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্‌ এর ক্ষমতা। আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীন বলেনঃ

মুহাম্মাদ (সা) আল্লাহ্‌রাসূল; আর যারা এর সাথে আছে তারা কাফিরদের বিরুদ্ধে কঠোর এবং নিজেদের মধ্যে পরস্পরে সহানুভূতিশীল...। [সূরা ফাত্‌হ; ৮৪:২৯]

...এবং তোমাদের প্রতি আল্লাহ্‌র যে নেয়ামত রয়েছে তা স্মরণ কর, যখন তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে তখন তিনিই তোমাদের অন্তঃকরণে প্রীতি স্থাপন করেছিলেন, তৎপরে তোমরা তাঁর অনুগ্রহে ভ্রাতৃত্বে আবদ্ধ হলে...। [সূরা আল-ইমরান; ৩:১০৩]

[৩] সুমহান লক্ষ্য অর্জন:

প্রকৃত সুখ-শান্তি অর্জন, পৃথিবীতে খেলাফাত (ইসলামিক কর্তৃত্ব ও শাসন ব্যবস্থা) প্রতিষ্ঠা, ইসলামের বিশুদ্ধ চর্চা এবং সমস্ত রকম বাতিল ও শয়তানি অপশক্তির আক্রমণের বিরুদ্ধে ধৈর্য এবং নিষ্ঠার সাথে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া- এসবের একটিও সম্ভব নয় লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্‌ এর বাস্তবিক প্রয়োগ ছাড়া। আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীন বলেনঃ

তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে সৎকর্ম করে আল্লাহ্‌ তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, তিনি তাদেরকে পৃথিবীতে খেলাফাত (প্রতিনিধিত্ব) অবশ্যই দান করবেন, যেমন তিনি (প্রতিনিধিত্ব) দান করেছিলেন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে এবং তিনি অবশ্যই সুদৃঢ় করবেন তাদের দ্বীনকে যা তিনি তাদের জন্যে মনোনীত করেছেন এবং তাদের ভয়-ভীতির পরিবর্তে তাদেরকে অবশ্যই নিরাপত্তা দান করবেন; তারা শুধু আমার ইবাদত করবে, আমার সাথে কাউকে শরীক করবেনা, অতঃপর যারা অকৃতজ্ঞ হবে তারা তো সত্যত্যাগী (ফাসিক) । [সূরা নূর; ২৪:৫৫]

কাজেই আল্লাহ্‌ রাব্বুল ‘আলামীন উল্লেখিত সুমহান লক্ষ্যসমূহের অর্জনকে আমাদের জন্য শর্তসাপেক্ষ করে দিয়েছেন। অর্থাৎ, আমরা এগুলো কেবল মাত্র তখনই অর্জন করতে সমর্থ হব যখন আমরা শুধু মাত্র এবং কেবলমাত্র তাঁরই ইবাদত এবং আনুগত্য করব, তাঁর দেয়া বিধানকে প্রশ্নাতীতভাবে মেনে চলব এবং তাঁর সাথে কোন শরীক স্থাপন করব না। আর এটাই হল “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্‌ এর নিহিত মর্মার্থ।

আল-ইস্‌তিক্কামাহ্‌, ইস্যু নং-১

পাদটীকাঃ

[১] লা ইলাহা ইল্লালাহ্‌, মানাহা, মাকানাতুহা ওয়া ফাদ্‌লুহা (পৃষ্ঠা নং:৩৬-৩৯) হতে সংক্ষেপিত ও পরিমার্জিত।

সহজ ছোট ভাল কাজ

শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু

লেখিকাঃ নূসরাত রহমান
আমাদের জীবনটা ত খুব ছোট। তার মধ্যে এক চতুর্থাংশ চলে যায় বড় হতে, শিখতে, বুঝতে। বড় হওয়ার পরেও তিন ভাগের একভাগ কাটে ঘুমিয়ে আর নিত্য প্রয়োজনীয় কাজ সারতেই। বাকি এত অল্প সময়টার মধ্যে পড়াশুনা, চাকুরি, ব্যবসা - এসব করব কী, সংসার চালাব কী.. আর আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজই বা করব কী?
আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করাও ত চাট্টিখানি কথা নয়, আগে জানতে ও বুঝতে হবে, নিয়্যতটাকে পরিষ্কার করতে হবে, তবেই না! এসব করে সেরে মোটামুটি সংসারের দায়িত্ব সেরে টেরে হিসেব মেলাতে গেলে দেখা যায়, ওমা! কবে জীবনের দুই তৃতীয়াংশ শেষ করে ফেলেছি, টেরই পাইনি! এখন এই শেষ সময়ে তড়িঘড়ি করে দানের টাকা দিয়ে ফেলা, একটু বেশি করে তজবি জপা.. সারাদিন জায়নামাজে বসে থাকা - এসব করতে হয়।
কিন্তু ওসবেও ত সমস্যা। আল্লাহ ত চান ভারসাম্যপূর্ণ জীবন। যখন যেখানে সুবিধা সেখানে হেলে পড়লে ত আর ভারসাম্য হল না। আল্লাহ চান আপনি যখন অফিসের কাজে দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তখনও আল্লাহ কে খুশি করুন, ছেলে মেয়ে দুটোর পরীক্ষা পরদিন সকালে - সিলেবাস শেষ করাতে করাতে আল্লাহকে মনে করুন.. এমন। তাহলে কীভাবে হবে?
এজন্যই, আমরা দিনের একেবারে খুঁটিনাটি ঘটনায় আল্লাহকে এনে ফেললে আর দিন শেষে তজবির উপর ভরসা করে থাকতে হবে না। এখানে অত্যন্ত সরল সোজা কিছু টিপস্ দেই।
  • প্রতিদিন একটু হাঁটা হয়না? হাঁটার সময়টা কী করেন আপনি? পা দিয়ে ত হাঁটাই হয়, মনটা দিয়ে কী করা হয়? কিছুই না, তাইনা? এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখা, আগের বা পরের কিছু ভাবা এসবই ত! এখন থেকে হাঁটার ছন্দের সাথে ছোট দু'আ (যেমন সুব-হা-নাল্-লাহ, ওয়ালহাম-দু-লিল্-লাহ, ওয়ালা-ইলাহা-ইল্লাল্-লাহু, ওয়াল্-লাহু-আক্ব-বার, অথবা সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহী সুবহানাল্লাহিল আযীম) মিলিয়ে পড়তে পড়তে হাঁটবেন। প্রথম প্রথম মনেই থাকবে না পড়ার কথা। তারপর একটা সময়ে পুরোপুরি প্রোগ্রাম হয়ে যাবে মাথার ভেতর। দিনে কত কদম হাঁটা হয়? দুহাজার? প্রতি ষোল কদমে যদি একবার করে দু'আটা শেষ করা হয়, দিন শেষে কতগুলি নেকী জমা পড়ল? কোন কষ্ট ছাড়াই?
  • এই ত গেল হাঁটা। গোনাগুনির কাজ করতে হয়না? আটটা ডিম, ছ'টা কলম, তিন তলা, কুড়িটা সিঁড়ি? এক দুই তিন করে না গুণে 'সুবহানাল্লাহ' 'ওয়ালহামদুলিল্লাহ' 'ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু' 'ওয়াল্লাহু আক্ববার' - এভাবে চার চার করে গুণে ফেলুন। একদম কোন ঝামেলা ছাড়া আরও আট দশবার দুআ পড়া হয়ে যাবে। গায়েই লাগবেনা।
  • তারপর নতুন সূরা শেখা হয়না কতবছর হল? শিখতে চান? পছন্দের তিলাওয়াতকারীর তিলাওয়াতের এমপিথ্রি চালিয়ে দিয়ে রাখুন মোবাইলে, গাড়িতে, ঘর গুছানোর সময় - গানের মত পুরোটা মাথায় কপি হয়ে যাবে দু'সপ্তাহ পর। এভাবে শুনে শেখার আরো সুবিধা হচ্ছে উচ্চারণও শুদ্ধ হবে, কোথায় কতটুকু বিরতি দিতে হবে, সব জানা হয়ে যাবে।  এইখানে ক্লিক করে mp3 তেলাওাত ডাউনলোড করে নিতে পারেন।
  • ক্লাসে যাবেন, বাজারে যাবেন, অফিসে যাবেন, জ্যামে বসে আছেন, মেজাজটা তিরিক্ষি - সময়টা কাজে লাগান একটা অডিও লেকচার শুনে। সেটা হতে পারে কুরআনের তাফসির, নবীদের জীবনী, পারিবারিক সম্পর্কের উপর ইসলামিক আলোচনা.. শুধু যে মেজাজ রক্ষা পাবে তাই না, অলস সময়টাতে অনেক ভাল ভাল চিন্তা মাথায় চলে আসবে। হঠাৎই হয়ত মনে হবে, 'আরে! এই কাজটা ত করা যায়!' ব্যাস, কোন রিকশাওলা কোন দিক দিয়ে ঢুকে গেল - এসব দেখে আর মেজাজ খারাপ হবে না। আপনি ত আর আপনার সময় নষ্ট করছেন না! ওরা যা ইচ্ছে করুক না!  এইখানে ক্লিক করে mp3 audio lecture ডাউনলোড করে নিতে পারেন।
এগুলো ছিল একদম কোন আয়াস ছাড়াই সওয়াব কুড়ানোর পদ্ধতি। এবার আসি একটু শ্রম দিতে হয় এমন কাজে।
  • বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে ভাল লাগে? তক্কে তক্কে থাকুন, কখন অসুস্থ হয় (তাই বলে আবার দোয়া করতে যাবেন না যেন অসুখে পড়ে); হলেই মিস নেই, দেখতে যান, ফোন করে খোঁজ নিন, অন্য সময়ের চেয়ে দুইবার বেশি ফোন দিন। শুধু বন্ধুর অসুখই না, বন্ধুর পরিবারের যে কারোর বেলায়ও। আল্লাহ ভীষণ খুশি হন এসব কাজে। আর তার উপর যদি আল্লাহকে খুশি করার নিয়্যতে করেন, তাহলে ত ডাবল লাভ!!
  • দাওয়াতে কোন মুরুব্বী কারও সাথে দেখা হয়? নানু দাদু শ্রেণীর, যারা পার্টি টার্টিতে চুপচাপ এক কোণে বসে থাকেন, সবাই দেখা হলে সালাম দিয়ে চলে যায়, কিন্তু কথা বলে না এমন বয়সের? পাশে গিয়ে বসে কথা বলতে শুরু করুন। এমনভাবে আধা ঘন্টা গল্প করুন, যাতে তাঁর মনে হয় এই সমাবেশে উনার সাথে সময় কাটিয়েই আপনি সবচেয়ে বেশি মজা পাচ্ছেন। চলে আসার সময় দেখবেন প্রাণঢালা দোয়ার ওজনে হাঁটতে পারছেন না।
  • পরিচিত মানুষজনের সাথে এমনভাবে নরম করে কথা বলা শুরু করুন, যাতে কেউ সমস্যায় পড়লে আপনার কাছে বলতে ভরসা পায়। তারপর সমাধান করতে পারেন না পারেন, একটু সুন্দর করে বলুন, 'হ্যা... সত্যিই ত... আসলেই ত সমস্যা... ধৈর্য ধরে থাকেন ভাই! আপনার ত অনেক ধৈর্য মাশাআল্লাহ!' হয়ে গেল! সে ভাই খুশি, আল্লাহ খুশি, আপনি খুশি। খুশিই খুশি।
  • যদি দেখেন কেউ একটা ভাল উদ্যোগ নিয়েছে, কিন্তু কাজটা সুন্দর করে হয়নি দেখে অনেক সমালোচনা করছে সবাই... খুব উৎসাহ দেখান। বলুন, জিনিসটা খুবই ভাল হয়েছে। সে যখন উৎসাহে টগবগ করতে থাকবে - তখন না হয় সময় নিয়ে ধীরে সুস্থে খুঁতগুলো ঠিক করার পরামর্শ দেবেন। ভাল কাজে এই যে উৎসাহ দিলেন, চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন - এতে করে আল্লাহ সে ভাল কাজের সওয়াবে আপনারও একটা অংশ লিখে রাখবেন ইনশাআল্লাহ।
  • ফিরে আসি হাঁটার কথায় আবারো। চাইলে এক জোড়া গ্লাভস/পলিথিন সাথে করে বের হতে পারেন। রাস্তায় ঠোঙা, পেপসির ক্যান, পলিথিন পড়ে থাকতে দেখলে তুলে ডাস্টবিনে ফেলে দেবেন। রাস্তার জিনিস পলিথিন মোড়া হাত দিয়ে ধরলে কিন্তু হাত খসে পড়ে যায় না। আমরা টাকা ধরার সময় আরো অনেক জীবাণু ধরি। আর ভাববেন না, আমি মিউনিসিপ্যালিটির পয়সা বাঁচানোর জন্য আপনাকে দিয়ে ফ্রি ফ্রি কাজ করাচ্ছি।
এগুলো সব সদকা। আখিরাতে ভাল কাজের পাল্লা ভারি করার কিছু ফ্রি টিপস।