শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু
লিখেছেনঃ মনসূর আহমেদ | অনুবাদক: মোহাম্মদ সলিমুল্লাহ
ওয়েব সম্পাদনাঃ মোঃ মাহমুদ ইবনে গাফফার
কিছুলোক অনেক দো‘আ করেন কিন্তু কোনো সাড়া পান না।
প্রশ্নঃ
দো‘আ
করলে তার উত্তর পেতে দেরি হয় কেন? কিছুলোক অনেক দো‘আ করেন কিন্তু কোনো
সাড়া পান না; তারা দীর্ঘকাল ধরে চাইতে থাকেন। কিন্তু কোনো ফল পান না। এমন
ক্ষেত্রগুলোতে আপনি দেখবেন শয়তান এমন লোকের কানে ফিসফিসানি শুরু করছে এবং
স্রষ্টা সম্পর্কে তাদের নেতিবাচক চিন্তা করতে জন্য শিক্ষা দিচ্ছে।
উত্তর:
প্রশংসা মাত্রই আল্লাহ্র জন্য।
প্রথমত:
যে
ব্যক্তির ক্ষেত্রে এটা ঘটে তার বিশ্বাস করা উচিৎ যে, দো‘আ করার পরও সাড়া
না পাওয়ার মাঝে একটি কারণ ও বিশাল এক প্রজ্ঞা লুকিয়া আছে। আল্লাহ্
সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা সার্বভৌমত্বের মালিক এবং কেউই তাঁর দয়াকে থামিয়ে
দিতে বা ক্ষমতাকে নস্যাৎ করতে পারে না। তিনি দয়া করে কাউকে কিছু দিতে
চাইলে বা ন্যায় বিচার করে কাউকে দিতে না চাইলে তার ইচ্ছেকে প্রভাবিত করে
এমন কোনো শক্তি বা সত্ত্বা নেই। আমরা তাঁর বান্দা আর আমাদের সাথে তাই করেন
যা তিনি ইচ্ছে করেন।
“আর তোমাদের প্রভু যা ইচ্ছা ও পছন্দ তা-ই সৃষ্টি করেন, এতে তাদের কোনো পছন্দের অবকাশ নেই।” [আল-কাসাস ২৮:৬৮]
কোন যুক্তিতে একজন কর্মচারী মালিককে তাঁর প্রাপ্য সম্মান না করেই নিজের পাওনা পুরোটাই দাবী করতে পারে?
অবাধ্যতা
নয় আনুগত্য, বিস্মরণ নয় স্মরণ, অকৃতজ্ঞতা নয় ধন্যবাদ পাওয়াটাই তাঁর
অধিকার। আপনি যদি নিজের দিকে তাকান আর দেখেন কিভাবে নিজ দ্বায়িত্ব পালন
করছেন, তবে নিজেকে খুবই নগন্য মনে হবে। আপনি অপমান বোধ করবেন আর উপলব্ধি
করবেন যে, তাঁর ক্ষমা ও দয়া ছাড়া কোনো মুক্তিই নেই। তাই সৃষ্টিকর্তা ও
নিয়ন্তা আল্লাহ্র দাস হিসেবেই নিজেকে দেখুন।
দ্বিতীয়ত:
আল্লাহ
মহাজ্ঞানী, তিনি কারণ ছাড়া কাউকে কিছু দেন না বা দেওয়া ফেরান না। আপনি
কোনো কিছুর দিকে তাকিয়ে সেটাকে খুব ভালো ভাবতে পারেন। কিন্তু তাঁর জ্ঞানে
এটা আবশ্যক নয়। একজন ডাক্তার এমন কিছু করতে পারেন যা আপনার কাছে যন্ত্রণা
দায়ক মনে হবে যদিও তা রোগীর সর্বোচ্চ স্বার্থেই করা হয়ে থাকে।
আর আল্লাহ্ই সর্বোচ্চ জ্ঞানের অধিকারী। (আল-নাহল ১৬:৬০)
তৃতীয়ত:
ব্যক্তিযা
চায় তার প্রত্যেকটিই তাকে দেয়া হলে তা তার জন্য অমঙ্গলজনকও হতে পারে।
একজন সালাফের বর্ণনানুযায়ী তিনি কোনো সামরিক অভিযানে যাওয়ার জন্য
আল্লাহ্র নিকট দো‘আ করতেন। কিন্তু তিনি একটি কণ্ঠ শুনতে পান: “তুমি সামরিক
অভিযানে গেলে বন্দী হবে। আর বন্দী হলে তুমি খ্রীস্টান হয়ে যাবে।” [সায়িদ আল-খাতির, ১/১০৯]
ইবনুল কায়্যিম বলেন: আল্লাহ
তাঁর বিশ্বাসী বান্দাদের জন্য যা নির্ধারণ করেছেন তা রহমত স্বরূপ। যদিও তা
প্রদাণ বন্ধ করে হতে পারে; পরীক্ষা হলেও সেটি কল্যাণকর। আর তাঁর নির্ধারিত
দূর্যোগও মঙ্গলজনক। যদিও তা পীড়াদায়ক হয়। [মাদারিজ আল-সালেকীন, ৪/২১৫]
কেউ
জানেনা তার বিষয়গুলো কিভাবে শেষ হবে। সে এমন কিছু চাইতে পারে যা তাকে
পরিচালিত করবে কুফলের দিকে যাতে তার ক্ষতি হয়ে যাবে। তার জন্য কোনটি
সবচেয়ে ভালো তা অদৃশ্যের মালিক আল্লাহ্ই ভালো জানেন।
“আর এমন হতে পারে তুমি যা অপছন্দ করছো তা তোমার জন্য মঙ্গলকর।”[আল-বাকারা ২:২১৬]
এ
আয়াতের একটি অর্থ হতে পারে যে, আমাদের এমন ভাবা উচিৎ নয় যে বিধাতার
বিধান অন্যরূপ অথবা তাঁর কাছে এমন কিছু চাওয়া উচিৎ নয় যে বিষয়ে আমাদের
জ্ঞান নেই এজন্য যে তা আমাদের অজান্তেই আমাদের ক্ষতি করবে। তাই আমাদের জন্য
আমাদের প্রভু যা পছন্দ করেছেন তা ভিন্ন অন্য কিছু আমাদের পছন্দ অরা উচিৎ
নয়। বরং তাঁর কাছে আমাদের কোনো শুভ পরিণতি কামনা করা উচিৎ। আর এটা এজন্য
যে, এছাড়া অধিকতর উপকারী আমাদের জন্য কিছুই আর নেই।
চতুর্থত:
বান্দা
নিজের জন্য যা পছন্দ করে তার চেয়ে আল্লাহ্ তার জন্য যা পছন্দ করেন তা-ই
শ্রেষ্ঠ। আল্লাহ্ তাঁর বান্দাকে এতোটাই ভালোবাসেন যতোটা বান্দা নিজেকেই
ভালবাসতে পারে না। যদি তার এমন কিছু হয় যা সে অপছন্দ করে, তাহলে সেটা না
ঘটার চেয়ে ঘটাই উত্তম; তাই তাঁর বিধান দয়া ও মমতায় ভরপুর। বান্দা যদি
আল্লাহ্র নিকট আত্মসমর্পণ করে আর বিশ্বাস করে যে, সকল ক্ষমতার উৎস
আল্লাহ্ এবং সবকিছুই তাঁর নিয়ন্ত্রানাধীন, এবং তার প্রতি তিনি নিজ
অপেক্ষা অধিক দয়াশীল, তবেই সে কাঙ্ক্ষিত বস্তুটি না পেলেও তার মানসিক
প্রশান্তি নষ্ট হবে না। দেখুন: মাদারিজ আল-সালিকীন, ২/২১৫
পঞ্চমত:
এমন
হতে পারে যে, ব্যক্তি এমন কিছু করেছেন যার জন্য তার দো‘আ কবুল হচ্ছে না বা
বিলম্ব হচ্ছে। হতে পারে তার খাদ্য হারাম; হতে পারে তিনি যখন দো‘আ করেছেন
তার মনে ঐকান্তিকতার অভাব ছিল; হতে পারে তিনি কোনো পাপে লিপ্ত থাকা
অবস্থায় দো‘আ করেছেন। তাই দো‘আর সাড়া পেতে দেরি হওয়াটা ব্যক্তির নিজেকে
সামলে নিতে, প্রভুর সম্মুখে কিভাবে দাঁড়াতে হবে তা শুধরে নিতে তাগিদ দেয়।
যাতে করে সে নিজে সংশোধিত ও অনুতপ্ত হয়; যদি সে দো‘আর সাড়া দ্রুত পেত
হয়ত সে বে-খেয়াল হয়ে যেত। যাকিছু করছে তা ঠিক বলে মনে করে তা করেই
যেতো। তারপর তার ভেতর আত্ম-তুষ্টির মনোভাব তৈরি হতো যা তাকে সর্বনাশের দিকে
নিয়ে যেতো।
দো‘আর সাড়া পেতে দেরি হওয়া বা কোনো সাড়া
পাওয়ার কারণ হতে পারে আল্লাহ্ চাচ্ছেন বান্দার পুরষ্কার কিয়ামত পর্যন্ত
দেরি করে দিতে। হয়তো তিনি চাচ্ছেন সমপরিমাণ কোনো পাপ মার্জনা করতে যা
বান্দা বুঝতে পারে না।
ঘটনা
যেটাই হোক, দো‘আর ফল অনিবার্য। যদিও হতে পারে আপনার চোখে আপনি তা দেখেন না।
তাই স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞ হোন এবং বলুন: সম্ভবত তিনি আমার দো‘আয় এমনভাবে
সাড়া দিয়েছেন যা আমি বুঝি না। সহীহ হাদীসে বর্ণিত আছে যে, নবী
(সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: “এমন কোনো মুসলিম নেই যে
আল্লাহর কাছে দো‘আ করে আর তার কোনো পাপ নেই বা পরিবারের বন্ধন ছিন্ন
করেনি, অথচ আল্লাহ্ তাকে তিন পদ্ধতির যে কোনোভাবে পুরষ্কার দেবেন: হয়তো
আল্লাহ্ তার দো‘আয় তাৎক্ষনিকভাবে সাড়া দেবেন, বা তিনি পরকালে প্রতিদান
দেয়ার জন্য জমা রাখবেন, অথবা এই কারণে তার সমপরিমান পাপ মোচন করে দেবেন।”
সাহাবাগণ (রা) জানতে চাইলেন: “আমরা যদি অনেক বেশি দো‘আ করি?” তিনি বললেন, “আল্লাহ্ ততোধিক মহান।” [হাদীসটি আহ্মাদ সংকলন করেছেন। সহীহুল তারগীব ওয়াত্তারহীব (১০৭৪৯) গ্রন্থে আল-আলবানী হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলে রায় দিয়েছেন।]
পরিশেষে, দো‘আ করে ফল লাভ না করার বা দেরিতে করার অনেক কারণ রয়েছে; এটা আমাদের অবশ্যই মানতে হবে এবং দো‘আ করা থামিয়ে দিলে চলবে না। কেননা দো‘আ সবসময়ই আমাদের জন্য কল্যাণ এবং মঙ্গল বয়ে আনে।
শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম
করুণাময়, অতি দয়ালু
লেখকঃ আলী হাসান তৈয়ব | সম্পাদনা
: ড. মোহাম্মদ মানজুরে
ইলাহী
প্রকৃতির
ধর্ম ইসলাম মানুষের স্বভাব ও প্রকৃতির সুস্থতার স্বার্থেই গান-বাজনাকে
নিষিদ্ধ করেছে। গান-বাজনা যেমন
আমাদের পরকাল
ভুলিয়ে দেয় তেমনি বস্তুজগতকেও দেয় ডুবিয়ে। এ গানের মাধ্যমেই দুর্বল
নৈতিকতসম্পন্ন লোকেরা বিশেষত তরুণ প্রজন্ম অবৈধ প্রেম ও লৌকিক ভালোবাসার
প্রতি উদ্বুদ্ধ হয়। আর এ প্রেম-ভালোবাসার প্রসাদ খেতে গিয়েই করতে বাধ্য
হয় অনেক অপরাধ। পছন্দের মেয়েকে ভালোবাসতে না পারলে তখনই নীতিহীন ও
আল্লাহভোলা ছেলেরা ঘটাতে থাকে ধর্ষণ, গুম, এসিডে মুখ ঝলসানোসহ নানা
অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। আর তা যদি হয় পরকীয়া, তবে এরই সূত্রে ঘটে স্ত্রী
কর্তৃক স্বামী খুন এমনকি রাক্ষুসী মায়ের হাতে নিষ্পাপ শিশুকে পর্যন্ত
হত্যার ঘটনা।
অনেকের ধারণা, দুঃখের সময় গান শুনলে বেদনা লাঘব
হয়। আসলে গান কখনো মনের বেদনা লাঘব করে না। বরং তাকে চাগিয়ে দেয়। এবং
না পাওয়ার হতাশায় ভেতরে হাহাকার তোলে। ভুলে যাওয়া মন্দ অতীতকে স্মরণ করে
দিয়ে ব্যাথাতুর ও ভগ্ন হৃদয় বানায়। যারা লৌকিক প্রেম ও ভালোবাসায়
আকণ্ঠ ডুবে আছে তাদের আরও উৎসাহিত করে আর যারা এখনো এ জগতে পা রাখে নি,
এ পথে তাদের অভিষেক ঘটায়। শুধু এতটুকু হলে তাও হতো। গান-বাজনার ভূমিকা এ
পর্যন্ত সীমাবন্ধ নয়। যারা এ গান-বাজনায় পুরোপুরি অভ্যস্ত হয়ে যায়,
তাদের কাছে পবিত্র কুরআনের মোহনীয় তিলাওয়াত কিংবা হৃদয়ছোঁয়া সুরে
সুন্দর জীবনের প্রতি আহ্বানকারী ইসলামী সঙ্গীতও ভালো লাগে না। বিশ্বাস না হলে আপনি পরীক্ষা করে
দেখতে পারেন। যারা সবসময় আমাদের সমাজটাকে রসাতলের পথে নেয়া গান-বাজনা ও
মিউজিকে অভ্যস্ত তাদের সামনে ইসলামী সঙ্গীত বা কোনো বিখ্যাত কারীর
তিলাওয়াত বাজিয়ে দেখুন। দেখবেন এগুলো তাদের টানবে না। তাদের ভেতরে কোনো
প্রতিক্রিয়াই সৃষ্ট করবে না।
(আল্লাহ আমাদের হিফাযত করুন।)
দুঃখজনক সত্য হলো, আজকাল এই
গান-বাজনা আমাদের সমাজকে এতো গভীরভাবে গ্রাস করেছে যে, অনেকেই জ্ঞাতে
অজ্ঞাতে কুরআন ও হাদীসের নানা
ফাঁক-ফোকর খোঁজার ব্যর্থ কৌশল গ্রহণ করে কিংবা মতলবী ব্যাখ্যার আশ্রয়
নিয়ে সমাজবিধ্বংসী এসব গান-বাজনার বৈধতা দেবার প্রয়াস পান। এদিকে যারা
ইসলামের কিছুই মানতে
রাজি নয় কিংবা একেবারে খোলা মন সাধারণ মুসলিম, তারা এ থেকে হন বিভ্রান্ত ও
দ্বিধাগ্রস্ত। এমনই এক বিভ্রান্ত ও দ্বিধাগ্রস্ত বোনের সন্ধান মেলে ফেসবুকে। একেবারে অজানা অদেখা এ
মুসলিম বোনের পুরাতন ফেসবুক স্ট্যাটাসগুলো ঘেঁটে মনে হলো তিনি বড় দীন
দরদী। বরাবর কাতর তিনি অন্যের হেদায়েত কামনায়।
একদিন তাঁর একটি
স্ট্যাটাস দেখতে পেলাম ইসলামে মিউজিক বিষয়ে। একটি ব্লগে পোস্ট করা
প্রাচ্যবাদে প্রভাবিত এক ব্যক্তির এ বিষয়ে লেখা একটি ইংরেজি নিবন্ধ বোধ
হয় তাঁকে বেশ প্রভাবিত করেছে। অনেক ইনিয়ে-বিনিয়ে এ নিবন্ধে মিউজিকের
খানিকটা সাফাই গাওয়া হয়েছে। বোনটি ফেসবুকে ওই লেখাটির লিংক দিয়েছেন দেখে
ভাবলাম এ লেখাতো তাঁর মতো আরও অনেককেই প্রভাবিত করতে পারে। ইসলামে নিষিদ্ধ
একটি বিষয়ে নমনীয় করতে পারে। তাই তাঁকে ইসলাম হাউজে দেয়া এ সংক্রান্ত
বেশ কিছু লেখার লিংক দিলাম। যাতে তাঁর বিভ্রান্তির ঘোর কেটে যায় এবং সবার
সামনে বাস্তবতা পরিষ্কার ফুটে ওঠে। আমার কমেন্টের জবাবে তিনি যা বললেন,
তাতে মনে হলো ইংরেজি ওই লেখার অগভীর যুক্তিগুলো সহসা তিনি উপেক্ষা করতে
পারছেন না। এটি একটি কনফিউশনের বিষয় বলে তিনি ইসলাম হাউজের লেখাগুলো
উপেক্ষা করতে চাইছেন বলে আমার মনে হলো।
সত্যি কথা বলতে কী, এ তো কোনো
কনফিউশনের বিষয়ই নয়। গান-বাদ্য তো কোনো অস্পষ্ট বা ধোঁয়াশাচ্ছন্ন বিষয়
নয়। পৃথিবীর সব আলেমই গান-বাদ্যকে হারাম বলেছেন। হাতে গোনা কয়েকজন এটাকে
বৈধ বলতে চেয়েছেন অস্পষ্ট বা ব্যতিক্রমী কিছু প্রমাণের আলোকে। তাঁদের
লেখা পড়ে শুধু তারাই দ্বিধায় পড়ি, আমরা যারা এটাকে বৈধ হিসেবে দেখতে
চাই। আমাদের ঈমানের মজবুত ভিত গড়ে না ওঠায়ই এমনটি হচ্ছে। নয়তো না ভেবেই
আমরা বলে দিতে পারতাম, পৃথিবীর সব আলেম যেখানে বিষয়টিতে একমত, সেখানে
দুয়েকজনের ব্যতিক্রমী বক্তব্য গ্রহণ করার তো কোনো প্রয়োজন নেই। এ গেল
যুক্তির কথা। এবার চলুন আল্লাহ ও তাঁর রাসূল আমাদের কী বলেন। আল্লাহ ও তাঁর
রাসূলের শিক্ষা কী। আমরা কি সবার
কথা গ্রহণ করবো? নাকি আল্লাহ ও তদীয় রাসূলের অনুসরণ করবো? মহান
আল্লাহ বলেন,
‘হে মুমিনগণ, তোমরা আনুগত্য
কর আল্লাহর ও আনুগত্য কর রাসূলের এবং তোমাদের মধ্য থেকে কর্তৃত্বের
অধিকারীদের। অতঃপর কোনো বিষয়ে যদি তোমরা মতবিরোধ কর তাহলে তা আল্লাহ ও
রাসূলের দিকে প্রত্যার্পণ করাও- যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান
রাখ। এটি উত্তম এবং পরিণামে উৎকৃষ্টতর।’ {সূরা আন-নিসা, আয়াত :
৫৯}
‘রাসূল তোমাদের যা দেয় তা
গ্রহণ কর, আর যা থেকে সে তোমাদের নিষেধ করে তা থেকে বিরত হও এবং আল্লাহকেই
ভয় কর, নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তি প্রদানে কঠোর।’ {সূরা আল-হাশর,
আয়াত : ০৭}
আল্লাহ ও রাসূলের কথা শোনার
পরও যদি আমরা তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেই, তা মানার ক্ষেত্রে টালবাহানা করে
করি, তবে তার চেয়ে মন্দ আর কি হতে পারে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
‘হে মুমিনগণ, তোমরা
আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর এবং তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিও না, অথচ
তোমরা শুনছ। আর তোমরা তাদের মত হয়ো না, যারা বলে আমরা শুনেছি অথচ তারা
শুনে না।’ {সূরা আল-আনফাল, আয়াত : ২০-২১}
অত্যন্ত
পরিতাপের বিষয় হলো আজ আমরা কালেমা পড়ি, সপ্তাহে একবার অন্তত মসজিদে
গিয়েও হাজিরা দেই; কিন্তু আল্লাহ ও রাসূলের নির্দেশ, বিধান ও বিচার আমাদের
কাছে তেমন গুরুত্ব পায় না। আমাদের কাছে অন্য কিছু আর ভিন্ন যুক্তিই
গ্রহণযোগ্য মনে হয়! আমাদের সতর্ক হওয়ার জন্য নিচের আয়াতগুলোই তো যথেষ্ট
হওয়া উচিত। মহান আল্লাহ বলছেন,
‘অতএব
তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের
ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে
ব্যাপারে নিজদের অন্তরে কোনো দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে
নেয়’। {সূরা নিসা : ৬৫}
‘তুমি কি তাদেরকে দেখনি,
যারা দাবী করে যে, নিশ্চয় তারা ঈমান এনেছে তার উপর, যা নাযিল করা হয়েছে
তোমার প্রতি এবং যা নাযিল করা হয়েছে তোমার পূর্বে। তারা তাগূতের কাছে
বিচার নিয়ে যেতে চায় অথচ তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে তাকে অস্বীকার
করতে। আর শয়তান
চায় তাদেরকে ঘোর বিভ্রান্তিতে বিভ্রান্ত করতে। আর যখন তাদেরকে বলা হয়,
‘তোমরা আস যা আল্লাহ নাযিল করেছেন তার দিকে এবং রাসূলের দিকে’, তখন
মুনাফিকদেরকে দেখবে তোমার কাছ থেকে সম্পূর্ণরূপে ফিরে যাচ্ছে। সুতরাং তখন
কেমন হবে, যখন তাদের উপর কোন মুসীবত আসবে, সেই কারণে যা তাদের হাত পূর্বেই
প্রেরণ করেছে? তারপর তারা আল্লাহর নামে শপথ করা অবস্থায় তোমার কাছে আসবে
যে, আমরা কল্যাণ ও সম্প্রীতি ভিন্ন অন্য কিছু চাইনি।’ {সূরা
আন-নিসা, আয়াত : ৬০-৬২}
আল্লাহ তা‘আলার
বিধান নিয়ে সমালোচনা করার সময় একজন মুসলিম কীভাবে ভুলে যায় যে সে
আল্লাহর নির্দেশাবলির মধ্যে কোনো কিছু নির্বাচন-বর্জনের অধিকার রাখে না।
তার অধিকার নেই কোনোটাকে গ্রহণ আর কোনোটাকে বর্জন করার। আল্লাহ তা‘আলা
বলেন,
‘তোমরা কি কিতাবের কিছু অংশে
ঈমান রাখ আর কিছু অংশ অস্বীকার কর? সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা তা করে
দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ছাড়া তাদের কী প্রতিদান হতে পারে? আর কিয়ামতের
দিনে তাদেরকে কঠিনতম আযাবে নিক্ষেপ করা হবে। আর তোমরা যা কর, আল্লাহ সে
সম্পর্কে গাফিল নন’। {সূরা আল-বাকারা, আয়াত : ৮৫}
উপরোক্ত
আয়াতগুলো থেকে আমাদের সামনে সুস্পষ্ট প্রতিভাত হয়, ঈমানের দাবী হলো,
যুক্তির পেছনে না পড়ে কিংবা কোনো ব্যক্তি স্বার্থের আহ্বানে সাড়া না
দিয়ে একমাত্র আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যে সাড়া দেয়া। আর এর দাবী
হলো, কোনো দ্বিধায় না জড়িয়ে অবৈধ গান-বাজনা থেকে তাওবা
করা। দুনিয়ার লৌকিক আকর্ষণের মোহে না পড়ে ঈমানের চিরন্তন স্বাদ গ্রহণে
সচেষ্ট হওয়া। সব অজুহাত দু পায়ে ঠেলে কেবল আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের
আনুগত্যেই নিজের সুখ ও শান্তি খোঁজা। গান-বাজনার অবৈধতার প্রশ্নে আসলেই কি কোনো কনফিউশন বা সংশয়ের অবকাশ
আছে? না, নেই। দেখুন ১৪ শতাব্দীকাল আগে এমন সব ব্যাপারে কত সুন্দর সমাধান ও
নির্দেশনা আমাদের দিয়েছেন আল্লাহর হাবীব।
নুমান ইবন বশীর রাদিআল্লাহু আনহু থেকে
বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে
বলতে শুনেছি, তিনি ইরশাদ করেন,
‘হালাল স্পষ্ট, হারামও স্পষ্ট। আর এ
দু’টির মাঝে রয়েছে সন্দেহজনক বিষয়সমূহ যা অধিকাংশ লোকই জানে না। সুতরাং
যে নিজেকে সন্দেহজনক বিষয় থেকে বাঁচিয়ে চলে, সে তার দ্বীন ও সম্মানের
সংরক্ষণ করে। আর যে সন্দেহজনক বিষয়ে জড়িয়ে পড়ে, তার উদাহরণ হচ্ছে সেই
রাখালের মত যে তার মেষপাল চরায় কোনো সংরক্ষিত চারণভূমির কাছাকাছি এমনভাবে
যে, যে কোনো মুহূর্তে সে তাতে প্রবেশ করবে। (হে লোকসকল,) সাবধান! প্রত্যেক
বাদশাহরই একটি সংরক্ষিত সীমানা আছে এবং আল্লাহর যমীনে তাঁর সংরক্ষিত সীমানা
হচ্ছে তাঁর নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ। সাবধান! শরীরে এমন একটি মাংস পিণ্ড রয়েছে
যা সুস্থ (পরিশুদ্ধ) থাকলে সারা শরীর সুস্থ থাকে, কিন্তু যদি তা কলুষিত
হয়ে যায় সারা শরীর কলুষিত হয় এবং সেটি হচ্ছে হৃদয়।’ [বুখারী : ৫২; মুসলিম : ৪১৭৮]
এটা
কোনো গোপন বিষয় নয়। এমন কিছু নয় যা অল্প কিছু মানুষ জানে কিংবা বিশেষ
অধিবেশনে অথবা খাস জমায়েতে শুধু তা জানানো হয়েছে। যেমন আবূ দারদা
রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম বলেন,
‘আমাদের সামনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
আবির্ভুত হলেন, তখন আমরা দারিদ্র এবং এ নিয়ে আমাদের শংকা নিয়ে আলাপ
করছিলাম। তিনি বললেন, ‘তোমরা দারিদ্রকে ভয় পাচ্ছো? শপথ সেই সত্তার যার
হাতে আমার প্রাণ, তোমাদের ওপর প্রবলভাবে দুনিয়াকে ঢেলে দেওয়া হবে এমনকি
তোমাদের কারও অন্তর কেবল শুধু সেদিকেই ঝুঁকবে। আল্লাহর শপথ, ‘আমি তোমাদের
রেখে যাচ্ছি পরিষ্কার সাদা সমতলে, যার দিন তার রাত্রির মতই।’ আবূ দারদা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু
বলেন, আল্লাহর শপথ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সত্যিই
আমাদের পরিষ্কার সাদা সমতলে রেখে যান, যার দিন তার রাত্রির মতই। [ইবন মাজা :
০৬; মুসনাদ বাযযার : ৪১৪১]
অন্যত্র
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
‘আমি তোমাদের রেখে যাচ্ছি পরিষ্কার সাদা সমতলে, যার দিন তার
রাত্রির মতই। তা থেকে কেউ বিচ্যুত হবে না; একমাত্র ধ্বংসপ্রাপ্ত ব্যক্তি
ছাড়া। অতএব আমার পরে যে বেঁচে থাকবে, অনেক বেশি মতবিরোধ দেখতে পাবে। তখন
তোমরা আমার সুন্নতের এবং হিদায়াতপ্রাপ্ত খলীফাদের আকড়ে ধরবে। মাড়ির দাঁত
দিয়ে তা আকড়ে থাকবে।’ [ইবন মাজা : ৪৩; মুসনাদ আহমদ : ১৭১৮২]
রাসূল
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এমন বক্তব্য জানার পর আমি মনে করি একটি
মিমাংসিত বিষয় নিয়ে দ্বিধান্বিত হবার কিছু নেই। ব্যতিক্রমী বক্তব্য
সন্দেহমুক্ত নয়। পক্ষান্তরে গান-বাদ্যের ব্যাপারে সবার বক্তব্য সুস্পষ্ট।
হ্যা, যেসব গানে অশ্লীল বক্তব্য নেই, মন্দের প্রতি আহ্বানও নেই আর অতি
অবশ্যই তাতে বাদ্যও নেই- সেসব তো ইসলামে অবৈধ নয়। তাই এসবের ওপর ভিত্তি
করে আমাদের সমাজে প্রচলিত চরিত্র বিধ্বংসী গান-বাদ্যের সপক্ষে যাবার কোনো
সুযোগ নেই।
আমরা নিজেরাই একটু ভেবে দেখতে পারি, আমাদের গান শুনতে
ভালো লাগে নাকি কুরআনের তিলাওয়াত? গানের প্রতি আমাদের মনোযোগ বেশি নাকি
তিলাওয়াতের প্রতি? সত্যি বললে, গানের প্রতিই। গান মানুষকে আল্লাহর যিকির ও
তাঁর ফিকির থেকে গাফেল করে বলেই একে হারাম করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে :
‘আর মানুষের মধ্য থেকে কেউ কেউ
না জেনে আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য বেহুদা কথা খরিদ
করে, আর তারা ঐগুলোকে হাসি-ঠাট্টা হিসেবে গ্রহণ করে; তাদের জন্য রয়েছে
লাঞ্ছনাকর আযাব।’ {সূরা লুকমান, আয়াত : ০৬-০৭}
যারা
মুসলিম উম্মাহর সবার ঐক্যমত্যের বাইরে গিয়ে গান-বাদ্যকে পরোক্ষভাবে
সমর্থন করছেন, আল্লাহ তাদের মাফ করুন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম তাঁদের ব্যাপারে আমাদেরকে চৌদ্দশ বছর আগেই সতর্ক করেছেন। তিনি
বলেন,
‘আমার উম্মতের মধ্যে এমন কিছু লোক সৃষ্টি হবে, যারা ব্যভিচার,
রেশম, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল সাব্যস্ত করবে।’ [সহীহ বুখারী : ৫৫৯০]
আশা
করি এ উদ্ধৃতিগুলো অধ্যয়ন ও অনুধাবন করার পর কেউ আর গান-বাজনার পেছনে
পড়বেন না। অবৈধ গান-বাজনা আমাদের পরিহার করতেই হবে। অতীতের শোনা গানগুলোর
জন্য এবং ভবিষ্যতে এ থেকে বেঁচে থাকতে তাওবা করতে হবে। আল্লাহ চান তো এ
কথাগুলো ফেসবুকের ওই বোনের মতো আপনাকে আমাকে কনফিউশন মুক্ত করবে। আল্লাহ
আমাদের সবাইকে তাঁর দীন সম্পর্কে সঠিক বুঝ দান করুন। আমাদের সবাইকে অবৈধ
গান-বাজনা থেকে দূরে থাকার তাওফীক দিন। আমীন!
শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম
করুণাময়, অতি দয়ালু
তাওবা
শব্দটি এক মহান শব্দ। এর অর্থ খুবই গভীর। এমন নয় যা অনেকেই মনে করে
থাকেন, মুখে শব্দটি বললাম অতঃপর গুনাহে লিপ্ত থাকলাম। আপনি আল্লাহর
নিম্নোক্ত বাণী অনুধাবন করে দেখুন। আল্লাহ্ কি বলছেন: “তোমরা
তোমাদের প্রভূর নিকট ক্ষমা
প্রার্থনা কর। অতঃপর তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন (তাওবা) কর।” (সূরা হুদ: ৩)
আয়াতের
মধ্যে সকলকে ক্ষমা চাইতে বলা হয়েছে, অতঃপর তাওবা করতে বলা হয়েছে। সুতরাং
তাওবা হচ্ছে ক্ষমা প্রার্থনার পর অতিরিক্ত আলাদা বিষয়।
কোন
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের জন্য অবশ্যই কিছু শর্ত থাকে। আলেম-ওলামাগণ কুরআন ও
হাদীস মন্থন করে তাওবার জন্য কতিপয় শর্ত উল্লেখ করেছেন, তা হলো:
এক:
দ্রুত পাপ থেকে বিরত হওয়া।
দুই:
পূর্বে যা ঘটে গেছে সে জন্য অনুতপ্ত হওয়া।
তিন:
পুনরায় পাপ কাজে ফিরে না আসার জন্য দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করা।
চার:
প্রাপকদের হক ফিরিয়ে দেয়া যা অন্যায়ভাবে নেয়া হয়েছিল অথবা তাদের নিকট
থেকে মাফ চেয়ে নেওয়া। আর খালেসভাবে তাওবার জন্য কতিপয় আলেম যেসব
শর্ত উল্লেখ করেছেন, নিম্নে সেগুলো উদাহরণসহ আলোচনা করা হচ্ছে। [এক]:
শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য পাপ ত্যাগ করা, অন্য কোন কারণে নয়,
যেমন; অক্ষমতার কারণে পাপ থেকে দূরে থাকা, এসব কর্ম করতে ভাল না লাগা
অথবা লোকজন মন্দ বলবে এই ভয়ে পাপ ত্যাগ করা। এজন্য তাকে তাওবাকারী বলা
হবে না, যে ব্যক্তি পাপ ত্যাগ করেছে তার মানহানী ঘটায় বা এর জন্য হয়তো
সে চাকুরীচ্যুত বা পদবী হারাতে পারে। তাকে তাওবাকারী বলা যাবে না, যে
ব্যক্তি পাপ ত্যাগ করল তার শক্তি ও স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য। যেমন; কেউ জেনা
করা ত্যাগ করলো যেন দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে বাঁচতে পারে অথবা তার শরীর ও
স্মৃতি শক্তিকে দুর্বল না করে।
তেমনিভাবে তাকে তাওবাকারী
বলা যাবে না, যে ব্যক্তি চুরি করা ছেড়ে দিয়েছে; কোন বাড়ীতে ঢুকার পথ না
পেয়ে বা সিন্দুক খুলতে অসমর্থ কিংবা পাহারাদার ও পুলিশের ভয়ে। তাকে
তাওবাকারী বলা যাবে না, যে দূর্নীতি দমন বিভাগের লোকজনদের জোর তৎপরতায় ধরা
পড়ার ভয়ে ঘুষ খাওয়া বন্দ রেখেছে।
আর তাকেও তাওবাকারী
বলা যাবে না, যে ব্যক্তি মদ পান, মাদকদ্রব্য বা হেরোইন সেবন ইত্যাদি ছেড়ে
দিয়েছে দারিদ্রের কারণে।
তেমনিভাবে তাকেও তাওবাকারী বলা
যাবে না, যে সামর্থহীন হওয়ার কারণে গুনাহ করা ছেড়ে দিলো। যেমন মিথ্যা বলা
ছেড়ে দিয়েছে তার কথায় জড়তা সৃষ্টি হওয়ার কারণে কিংবা জেনা করছে না
যেহেতু সে সহবাস ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে, কিংবা চুরি করা ছেড়ে দিয়েছে আহত
হয়ে পঙ্গু হয়ে পড়ার কারণে। বরং এসবে অবশ্যই অনুতপ্ত হতে হবে, সব
ধরনের পাপ থেকে মুক্ত হতে হবে এবং অতীত কর্মকান্ডের জন্য লজ্জিত হয়ে
আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।
এ জন্যেই রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “অনুতপ্ত হওয়াই হলো তাওবা।”(আহমাদ,
ইবনে মাজা, সহীহ আল-জামে ৬৮০২)
মহান আল্লাহ আকাংখা
পোষণকারী অপারগকে কর্ম সম্পাদনকারীর মর্যাদায় ভূষিত করেছেন। আপনি জানেন
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি বলেছেন:
“দুনিয়া চার
প্রকার লোকের জন্য;
(১) সেই বান্দার জন্য যাকে
আল্লাহ মাল ও জ্ঞান দান করেছেন সুতরাং সে এতে তার প্রভূকে ভয় করছে, তার
আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক রাখছে এবং তার ব্যাপারে আল্লাহর হক জানছে, এ হলো
সর্বোত্তম অবস্থানে।
(২) সেই বান্দা যাকে আল্লাহ জ্ঞান
দান করেছেন কিন্তু মাল দেননি, সে হলো সঠিক নিয়তের লোক, সে বলে, যদি আমার
টাকা পয়সা থাকতো তাহলে উমুক ব্যাক্তির মত কাজ করতাম। সে তার নিয়ত
অনুযায়ী সওয়াব পাবে। এদের দুজনের নেকী সমান হবে।
(৩) আর
সেই বান্দা যাকে আল্লাহ টাকা পয়সা দিয়েছেন কিন্তু জ্ঞান দান করেননি। সে
না জেনেই তার টাকা পয়সা খরচ করছে। এতে সে আল্লাহকে ভয় করে না, আত্মীয়তা
রক্ষা করে না এবং এতে আল্লাহর হকও সে জানে না। সে হলো সর্ব নিকৃষ্ট
অবস্থানে।
(৪) আর সেই বান্দা যাকে আল্লাহ মালও দেননি
জ্ঞানও দেননি, সে বলে আমার টাকা পয়সা থাকলে উমুকের মতই (খারাপ কাজ) করতাম।
সে তার নিয়ত অনুযায়ী প্রতিদান পাবে। এরা দুজনই গুনাহর দিক থেকে সমান। (আহমদ,
তিরমিযী, সহীহুত তারগীব ওয়াত তারহীব: ১/৯) [দুই]:
পাপের কদর্যতা ও ভয়াবহতা অনুভব করা; অর্থাৎ সঠিক তাওবার সাথে
কখনো আনন্দ ও মজা পাওয়া যাবেনা অতীত পাপের কথা স্মরণ হলে অথবা কখনো
ভবিষ্যতে সেসব কাজে ফিরে যাবে, এ কামনা মনে স্থান পাবে না।
ইবনুল
কাইয়্যেম রহমতুল্লাহ আলাইহে তার লিখা [الداء والدواء] ‘রোগ ও চিকিৎসা’
এবং [الفوائد] ‘আল্ফাওয়াইদ’ নামক গ্রন্থে গুনাহের অনেক ক্ষতির কথা উল্লেখ
করেছেন। তন্মধ্যে: জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হওয়া, অন্তরে একাকিত্ব অনুভব করা,
কাজকর্ম কঠিন হয়ে যাওয়া, শরীর দুর্বল হয়ে যাওয়া, আল্লাহর আনুগত্য থেকে
বঞ্চিত হওয়া, বরকত কমে যাওয়া, কাজে সমন্বয় না হওয়া, গুনাহর কাজে
অভ্যস্থ হয়ে যাওয়া, আল্লাহর ব্যাপারে পাপীর অনাসক্তি সৃষ্টি হয় এবং
লোকজন তাকে অশ্রদ্ধা করে, জীবজন্তু তাকে অভিশাপ দেয়, সে সর্বদা অপমানিত
হতে থাকে, অন্তরে মোহর পড়ে যায়, লানতের মাঝে পড়ে এবং দু’আ কবুল হয় না,
জলে ও স্থলে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়, আত্মমর্যাদাবোধ কমে যায়, লজ্জা চলে
যায়, নিয়ামত দূর হয়ে যায়, আজাব নেমে আসে, পাপীর অন্তরে সর্বদা ভয় নেমে
আসে এবং সে শয়তানের দোসরে পরিণত হয়, তার জীবন সমাপ্ত হয় মন্দের উপর এবং
পরকালীন আজাবে নিপতিত হয়।
পাপের এই ক্ষতি ও বিপর্যয়
যদি বান্দা জানতে পারে তাহলে সে পাপ থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকবে। কিছু কিছু
লোক এক পাপ ছেড়ে আরেক পাপ করতে শুরু করে তার কিছু কারণ হলো:
১.
মনে করে যে, এর পাপ কিছুটা হালকা। ২. মন পাপের দিকে বেশী আকৃষ্ট হয়
এবং এর দিকে ঝোক খুবই প্রবল থাকে। ৩. এ পাপ করার জন্য পারিপার্শিক
অবস্থা সহজ ও সহায়ক হয় অন্যটির তুলনায়, অন্য পাপের মোকাবেলায় যার জন্য
অনেক কিছু জোগাড় করা লাগে। ৪. তার সঙ্গী সাথীরা এ পাপের সাথে জড়িত,
তাদেরকে ত্যাগ করা কঠিন বলে মনে হয়।
৫. কোন কোন ব্যক্তির
নিকট বিশেষ পাপ তার মান সম্মানের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় তার সঙ্গী সাথীদের
মাঝে। এজন্য সে চিন্তা করে যেন তার অবস্থান সে ধরে রাখে এবং এ পাপ অব্যাহত
রাখে, যেমনটি ঘটে বিভিন্ন অপরাধ ও সন্ত্রাসী গ্র“পের প্রধানদের বেলায়।
যেমনটি ঘটেছিল অশ্লীল কবি আবু নাওয়াসের বেলায়, যখন তাকে কবি আবুল
আতাহিয়া উপদেশ দেয় ও ভর্ৎসনা করে তার পাপের জন্য। সে তখন জবাবে লিখে -
হে
আতাহিয়া! তুমি কি চাও আমি ছেড়ে দেই আনন্দ ফূর্তি করা তুমি কি
চাও আমি ধর্মকর্ম করে হারিয়ে ফেলি আমার লোকদের কাছে আমার মর্যাদা। [তিন]:
যার জন্য তাওবার প্রয়োজন সে যেন তাড়াতাড়ি তাওবা করে। কারণ তাওবা করতে
দেরী করাটাই পাপ। [চার]: আল্লাহর হক যা
ছুটে গেছে তা যথাসম্ভব আদায় করা। যেমন জাকাত দেয়া যা সে পূর্বে দেয়নি।
কেননা এতে আবার দরিদ্র লোকজনের অধিকারও রয়েছে। [পাঁচ]:
পাপের স্থানকে ত্যাগ করা যদি সেখানে অবস্থান করলে আবার সে পাপে
জড়িয়ে পড়ার আশংকা থাকে। [ছয়]: যারা
পাপ কাজে সহযোগিতা করে তাদেরকে পরিত্যাগ করা (এটিও পূর্ববর্তী ১০০টি লোক
হত্যাকারীর হাদীস থেকে গ্রহণ করা হয়েছে।) মহান আল্লাহ বলেন:
“আন্তরিক বন্ধুরাই সেদিন একে অপরের শত্রুতে পরিণত হবে, মুত্তাকীরা ছাড়া।”
(সূরা আল-যুখরুফ: ৬৭)
খারাপ সাথীরা একে অপরকে
কিয়ামতের দিন অভিশাপ দিবে। এজন্য হে তাওবাকারী, আপনাকে এদের সাথে সম্পর্ক
ছিন্ন করতে ও এদের থেকে সতর্ক থাকতে হবে, যদি আপনি তাদেরকে দাওয়াত দিতে
অপারগ হন। শয়তান যেন আপনার ঘাড়ে আবার সওয়ার হবার সুযোগ না পায় এবং
আপনাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে আবার কুপথে নিয়ে না যায়। আর আপনি তো জানেন যে,
আপনি দুর্বল তাকে প্রতিরোধ করতে সক্ষম হবেন না। এ ধরণের অনেক ঘটনা রয়েছে
যে, অনেক লোকই তার পুরাতন বন্ধু বান্ধবের সাথে সম্পর্কিত হওয়ার পর আবার
পাপে জড়িয়ে পড়েছে। [সাত]: নিজের কাছে
রক্ষিত হারাম জিনিসকে নষ্ট করে ফেলা। যেমন মাদক দ্রব্য, বাদ্যযন্ত্র, যেমন
একতারা, হারমনিয়াম, অথবা ছবি, ব্লু ফ্লিম, অশ্লীল নভেল নাটক। এগুলো নষ্ট
করে ফেলতে হবে অথবা পুড়িয়ে ফেলতে হবে। তাওবাকারীকে সঠিক পথে দৃঢ়ভাবে
থাকার জন্য অবশ্যই সব জাহেলিয়াতের জিনিস থেকে মুক্ত হতে হবে। এ ধরণের অনেক
ঘটনা রয়েছে, যাতে দেখা যায়, এসব হারাম জিনিসই তাওবাকারীর পূর্বের
অবস্থানে ফিরে যাবার পিছনে প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এর দ্বারাই সে
পথভ্রষ্ট হয়েছে। আমরা আল্লাহর নিকট সঠিক পথে টিকে থাকার জন্য তাওফীক
কামনা করছি। [আট]: ভাল সঙ্গী-সাথী গ্রহণ
করতে হবে যারা তাকে দ্বীনের ব্যাপারে সহায়তা করবে এবং এরা হবে খারাপ
সঙ্গী সাথীর বিকল্প। আর চেষ্টা করতে হবে বিভিন্ন ধর্মীয় ও ইলমী আলোচনায়
বসার জন্য। নিজেকে সব সময় এমন কাজে মশগুল রাখতে হবে যাতে কল্যাণ রয়েছে,
যেন শয়তান তাকে পূর্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেবার সুযোগ না পায়। [নয়]:
নিজ শরীরের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে যাকে সে হারাম দিয়ে প্রতিপালন
করেছে। একে আল্লাহর আনুগত্যের কাজে লাগাতে হবে এবং হালাল রুজি খেতে হবে যেন
শরীরে আবার পবিত্র রক্ত-মাংস সৃষ্টি হয়। [দশ]: তাওবা
দম আটকে যাওয়া বা ফুরিয়ে যাবার (মৃত্যুর পূর্বক্ষণে শ্বাসকষ্ট শুরু
হবার) পূর্বে এবং পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হবার পূর্বে হতে হবে।
ঘড়ঘড়ার অর্থ হলো কণ্ঠনালী হতে এমন শব্দ বের হওয়া যা মৃত্যুর পূর্ব
মুহূর্তে হয়ে থাকে। এর উদ্দেশ্য হলো কিয়ামতের পূর্বেই তাওবা করতে হবে তা
ছোট কিয়ামত হোক (মৃত্যু) বা বড় কিয়ামতই হোক (পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত
হওয়া)।
কেননা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেন: “যে ব্যক্তি আল্লাহর নিকট তাওবা করবে ঘড়ঘড়া উঠার পূর্বে, আল্লাহ
তার তাওবা কবুল করবেন।” (আহমাদ, তিরমিযী, সহীহ আল জামে’ : ৬১৩২)
Source: সরলপথ
শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম
করুণাময়, অতি দয়ালু
১ম পর্ব | ২য় পর্ব | ৩য় পর্ব
আপনি
হয়তো বলতে পারেন, যখন আমার দ্বারা পাপ হয়ে যাবে তখন কিভাবে দ্রুত তাওবা
করতে পারি? এমন কোন কাজ রয়েছে কি যা পাপ করার সাথে সাথেই করতে পারি? উত্তর:
পাপ থেকে বিরত হয়েই দুটি কাজ করতে হবে: এক:
অন্তঃকরণের কাজ হলো অনুতপ্ত হওয়া এবং এই বলে দৃঢ় সংকল্প নেয়া যে, এ
ধরণের কাজ আর করবো না। এটি হবে মূলত আল্লাহর ভয়ের ফলে। দুই:
অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কাজ বিভিন্ন প্রকারের নেকীর কাজ করার মাধ্যমে। এর মধ্যে
অন্যতম হলো তাওবার নামায। এর দলীল হলো: হযরত আবু বকর রাযিআল্লাহু তা’আলা
আনহু হতে বর্ণিত তিনি বলেন আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া
সাল্লামকে বলতে শুনেছি, কোন মানুষ পাপ করার পর যদি পবিত্রতা অর্জন করে,
অতঃপর নামায পড়ে এরপর আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে, তাহলে আল্লাহ
তাকে ক্ষমা করে দেবেন। (আসহাবুস সুনান, সহীহ আত্তারগীব ওয়াত্তারহীব ১/২৮৪)
অতঃপর
তিনি এ আয়াত পাঠ করেন: “যারা অশ্লীল কাজ করার পর অথবা
নিজেদের প্রতি জুলুম করার পর আল্লাহকে স্মরণ করে এরপর নিজেদের পাপের জন্য
ক্ষমা প্রার্থনা করে, আর আল্লাহ ব্যতীত গুনাহ সমূহ ক্ষমা করতে কেউ সক্ষম
নয় এবং তারা নিজেদের কৃতকর্মের উপর অটল থাকে না এবং তারা (গুনাহের বা
পাপের উপর অটল থাকার ভীষণ পরিণাম) জানে।” (সূরা আলে-ইমরান: ১৩৫)
অন্যান্য
সহীহ বর্ণনায় এসেছে এই দু’রাকাতের গুণাবলীর কথা যা গুনাহ মাফের কারণ হবে
তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ: (১) যে কেউ
সুন্দরভাবে অযু করে তার সগীরা গুনাহ মাফ করে দেয়া হয় (কেননা অযু করলে ধৌত
অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সগীরা পাপ পানির সাথে অথবা পানির শেষ বিন্দুর সাথে ঝরে
পড়ে) আর উত্তমভাবে অযু হলো: প্রথমে বিসমিল্লাহ বলে শুরু করা এবং শেষে এ
দু’আ করা: আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু
লা শারীকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহু”
“আমি
সাক্ষ্য দিচিছ যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন সত্য মাবুদ নেই। তিনি একক তাঁর কোন
শরীক নেই এবং আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ তাঁর বান্দা ও রাসূল।
হে
আল্লাহ! আমাকে তাওবাকারীদের এবং পবিত্রতা অর্জনকারী ব্যাক্তিদের
অন্তর্ভুক্ত করুন। হে আল্লাহ! আপনার স্তুতির সাথেই আমি আপনার প্রশংসা করছি।
আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি ব্যতীত কোন সত্য মাবুদ নেই। আমি আপনার নিকট
ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং আপনার নিকট তাওবা করছি।” (২)
এতে মনে মনে কোন কথা বলা যাবে না। (৩) এতে
একাগ্রতা ও বিনয়ীভাব আনতে হবে। (৪) এরপর ক্ষমা
প্রার্থনা করতে হবে।
পূর্বোক্ত কাজের ফলাফল:
(ক)
পূর্বের সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে। (খ) জান্নাত অবধারিত হয়ে
যাবে। (সহীহ আততারগীব ১/৯৪-৯৫)
(গ) বেশী বেশী নেকী ও
সৎকর্ম করা।
আপনি সহীহ হাদীসে উল্লিখিত এই উদাহরণটি
ভালভাবে চিন্তা করে দেখুন! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম
বলেছেন: “ঐ ব্যক্তির উদাহরণ হলো, যে খারাপ কাজ করে সে
সেই ব্যক্তির মত যার গায়ে খুব আটোসাটো লৌহবর্ম চাপান আছে যা তাকে চেপে
ধরে রেখেছে, অতঃপর সে একটি নেক কাজ করলে একটি আংটা খুলে গেল, অতঃপর আরেকটি
নেক কাজ করলে আরেকটি আংটা খুলে গেল, এভাবে সব খুলে মাটিতে পড়ে যায়”।
(মুসনাদে
আহমাদ, তাবারানী)
সুতরাং নেকী পাপীকে গুনাহের
বন্দীখানা থেকে মুক্ত করে তাকে আনুগত্যের প্রশস্ত ময়দানে বের করে নিয়ে
আসে। প্রিয় ভাই! নিচের ঘটনা আপনাকে বিষয়টি আরো পরিষ্কার করে দিবে।
হযরত
ইবনে মাসউদ রাযিআল্লাহু তা’আলা আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে বলে,
হে
আল্লাহর রাসূল! আমি এক মহিলাকে বাগানের ভিতর একাকী পেয়ে সব কিছুই করেছি
কিন্তু সহবাস করিনি। চুমা খেয়েছি, তাকে চেপে ধরেছি, এছাড়া আর কিছু করিনি।
এখন আপনি আমার ব্যাপারে যা ইচ্ছা করতে পারেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে কিছু বললেন না, সুতরাং লোকটি চলে গেল। অতঃপর হযরত
উমর রাযিআল্লাহু তা’আলা আনহু বলেন, আল্লাহ লোকটির অবস্থা গোপন রেখেছিলেন
যদি সে নিজের কথা গোপন রাখত। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া
সাল্লাম চোখ তুলে তাকালেন এবং বললেন, ওকে আমার কাছে নিয়ে এসো। যখন
তাকে ডেকে নিয়ে আসা হলো তখন তাকে এ আয়াত পাঠ করে শুনালেন: “আপনি
নামাজ প্রতিষ্ঠা করুন দিনের দুই প্রান্তে এবং রাতের একটি অংশে। নিশ্চয়ই
নেকী গুনাহকে মিটিয়ে দেয়। এটি হলো উপদেশ, উপদেশ গ্রহণকারীদের জন্য।”
(সূরা হুদ: ১১৪)
মুয়ায রাযিআল্লাহু তা’আলা
আনহু বলেন, অপর বর্ণনায় এসেছে হযরত উমার থেকে তিনি বললেন: হে আল্লাহর
রাসুল! এটি কি তার একার জন্য না সকল মানুষের জন্য? তখন তিনি বললেন, বরং
সমস্ত মানুষের জন্য। (মুসলিম) Source: সরলপথ
শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম
করুণাময়, অতি দয়ালু
তাওবা
শব্দটি এক মহান শব্দ। এর অর্থ খুবই গভীর। এমন নয় যা অনেকেই মনে করে
থাকেন, মুখে শব্দটি বললাম অতঃপর গুনাহে লিপ্ত থাকলাম। আপনি আল্লাহর
নিম্নোক্ত বাণী অনুধাবন করে দেখুন। আল্লাহ্ কি বলছেন: “তোমরা
তোমাদের প্রভূর নিকট ক্ষমা
প্রার্থনা কর। অতঃপর তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন (তাওবা) কর।” (সূরা হুদ: ৩)
আয়াতের
মধ্যে সকলকে ক্ষমা চাইতে বলা হয়েছে, অতঃপর তাওবা করতে বলা হয়েছে। সুতরাং
তাওবা হচ্ছে ক্ষমা প্রার্থনার পর অতিরিক্ত আলাদা বিষয়।
কোন
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের জন্য অবশ্যই কিছু শর্ত থাকে। আলেম-ওলামাগণ কুরআন ও
হাদীস মন্থন করে তাওবার জন্য কতিপয় শর্ত উল্লেখ করেছেন, তা হলো:
এক:
দ্রুত পাপ থেকে বিরত হওয়া।
দুই:
পূর্বে যা ঘটে গেছে সে জন্য অনুতপ্ত হওয়া।
তিন:
পুনরায় পাপ কাজে ফিরে না আসার জন্য দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করা।
চার:
প্রাপকদের হক ফিরিয়ে দেয়া যা অন্যায়ভাবে নেয়া হয়েছিল অথবা তাদের নিকট
থেকে মাফ চেয়ে নেওয়া। আর খালেসভাবে তাওবার জন্য কতিপয় আলেম যেসব
শর্ত উল্লেখ করেছেন, নিম্নে সেগুলো উদাহরণসহ আলোচনা করা হচ্ছে। [এক]:
শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য পাপ ত্যাগ করা, অন্য কোন কারণে নয়,
যেমন; অক্ষমতার কারণে পাপ থেকে দূরে থাকা, এসব কর্ম করতে ভাল না লাগা
অথবা লোকজন মন্দ বলবে এই ভয়ে পাপ ত্যাগ করা। এজন্য তাকে তাওবাকারী বলা
হবে না, যে ব্যক্তি পাপ ত্যাগ করেছে তার মানহানী ঘটায় বা এর জন্য হয়তো
সে চাকুরীচ্যুত বা পদবী হারাতে পারে। তাকে তাওবাকারী বলা যাবে না, যে
ব্যক্তি পাপ ত্যাগ করল তার শক্তি ও স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য। যেমন; কেউ জেনা
করা ত্যাগ করলো যেন দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে বাঁচতে পারে অথবা তার শরীর ও
স্মৃতি শক্তিকে দুর্বল না করে।
তেমনিভাবে তাকে তাওবাকারী
বলা যাবে না, যে ব্যক্তি চুরি করা ছেড়ে দিয়েছে; কোন বাড়ীতে ঢুকার পথ না
পেয়ে বা সিন্দুক খুলতে অসমর্থ কিংবা পাহারাদার ও পুলিশের ভয়ে। তাকে
তাওবাকারী বলা যাবে না, যে দূর্নীতি দমন বিভাগের লোকজনদের জোর তৎপরতায় ধরা
পড়ার ভয়ে ঘুষ খাওয়া বন্দ রেখেছে।
আর তাকেও তাওবাকারী
বলা যাবে না, যে ব্যক্তি মদ পান, মাদকদ্রব্য বা হেরোইন সেবন ইত্যাদি ছেড়ে
দিয়েছে দারিদ্রের কারণে।
তেমনিভাবে তাকেও তাওবাকারী বলা
যাবে না, যে সামর্থহীন হওয়ার কারণে গুনাহ করা ছেড়ে দিলো। যেমন মিথ্যা বলা
ছেড়ে দিয়েছে তার কথায় জড়তা সৃষ্টি হওয়ার কারণে কিংবা জেনা করছে না
যেহেতু সে সহবাস ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে, কিংবা চুরি করা ছেড়ে দিয়েছে আহত
হয়ে পঙ্গু হয়ে পড়ার কারণে। বরং এসবে অবশ্যই অনুতপ্ত হতে হবে, সব
ধরনের পাপ থেকে মুক্ত হতে হবে এবং অতীত কর্মকান্ডের জন্য লজ্জিত হয়ে
আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।
এ জন্যেই রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “অনুতপ্ত হওয়াই হলো তাওবা।”(আহমাদ,
ইবনে মাজা, সহীহ আল-জামে ৬৮০২)
মহান আল্লাহ আকাংখা
পোষণকারী অপারগকে কর্ম সম্পাদনকারীর মর্যাদায় ভূষিত করেছেন। আপনি জানেন
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি বলেছেন:
“দুনিয়া চার
প্রকার লোকের জন্য;
(১) সেই বান্দার জন্য যাকে
আল্লাহ মাল ও জ্ঞান দান করেছেন সুতরাং সে এতে তার প্রভূকে ভয় করছে, তার
আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক রাখছে এবং তার ব্যাপারে আল্লাহর হক জানছে, এ হলো
সর্বোত্তম অবস্থানে।
(২) সেই বান্দা যাকে আল্লাহ জ্ঞান
দান করেছেন কিন্তু মাল দেননি, সে হলো সঠিক নিয়তের লোক, সে বলে, যদি আমার
টাকা পয়সা থাকতো তাহলে উমুক ব্যাক্তির মত কাজ করতাম। সে তার নিয়ত
অনুযায়ী সওয়াব পাবে। এদের দুজনের নেকী সমান হবে।
(৩) আর
সেই বান্দা যাকে আল্লাহ টাকা পয়সা দিয়েছেন কিন্তু জ্ঞান দান করেননি। সে
না জেনেই তার টাকা পয়সা খরচ করছে। এতে সে আল্লাহকে ভয় করে না, আত্মীয়তা
রক্ষা করে না এবং এতে আল্লাহর হকও সে জানে না। সে হলো সর্ব নিকৃষ্ট
অবস্থানে।
(৪) আর সেই বান্দা যাকে আল্লাহ মালও দেননি
জ্ঞানও দেননি, সে বলে আমার টাকা পয়সা থাকলে উমুকের মতই (খারাপ কাজ) করতাম।
সে তার নিয়ত অনুযায়ী প্রতিদান পাবে। এরা দুজনই গুনাহর দিক থেকে সমান। (আহমদ,
তিরমিযী, সহীহুত তারগীব ওয়াত তারহীব: ১/৯) [দুই]:
পাপের কদর্যতা ও ভয়াবহতা অনুভব করা; অর্থাৎ সঠিক তাওবার সাথে
কখনো আনন্দ ও মজা পাওয়া যাবেনা অতীত পাপের কথা স্মরণ হলে অথবা কখনো
ভবিষ্যতে সেসব কাজে ফিরে যাবে, এ কামনা মনে স্থান পাবে না।
ইবনুল
কাইয়্যেম রহমতুল্লাহ আলাইহে তার লিখা [الداء والدواء] ‘রোগ ও চিকিৎসা’
এবং [الفوائد] ‘আল্ফাওয়াইদ’ নামক গ্রন্থে গুনাহের অনেক ক্ষতির কথা উল্লেখ
করেছেন। তন্মধ্যে: জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হওয়া, অন্তরে একাকিত্ব অনুভব করা,
কাজকর্ম কঠিন হয়ে যাওয়া, শরীর দুর্বল হয়ে যাওয়া, আল্লাহর আনুগত্য থেকে
বঞ্চিত হওয়া, বরকত কমে যাওয়া, কাজে সমন্বয় না হওয়া, গুনাহর কাজে
অভ্যস্থ হয়ে যাওয়া, আল্লাহর ব্যাপারে পাপীর অনাসক্তি সৃষ্টি হয় এবং
লোকজন তাকে অশ্রদ্ধা করে, জীবজন্তু তাকে অভিশাপ দেয়, সে সর্বদা অপমানিত
হতে থাকে, অন্তরে মোহর পড়ে যায়, লানতের মাঝে পড়ে এবং দু’আ কবুল হয় না,
জলে ও স্থলে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়, আত্মমর্যাদাবোধ কমে যায়, লজ্জা চলে
যায়, নিয়ামত দূর হয়ে যায়, আজাব নেমে আসে, পাপীর অন্তরে সর্বদা ভয় নেমে
আসে এবং সে শয়তানের দোসরে পরিণত হয়, তার জীবন সমাপ্ত হয় মন্দের উপর এবং
পরকালীন আজাবে নিপতিত হয়।
পাপের এই ক্ষতি ও বিপর্যয়
যদি বান্দা জানতে পারে তাহলে সে পাপ থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকবে। কিছু কিছু
লোক এক পাপ ছেড়ে আরেক পাপ করতে শুরু করে তার কিছু কারণ হলো:
১.
মনে করে যে, এর পাপ কিছুটা হালকা। ২. মন পাপের দিকে বেশী আকৃষ্ট হয়
এবং এর দিকে ঝোক খুবই প্রবল থাকে। ৩. এ পাপ করার জন্য পারিপার্শিক
অবস্থা সহজ ও সহায়ক হয় অন্যটির তুলনায়, অন্য পাপের মোকাবেলায় যার জন্য
অনেক কিছু জোগাড় করা লাগে। ৪. তার সঙ্গী সাথীরা এ পাপের সাথে জড়িত,
তাদেরকে ত্যাগ করা কঠিন বলে মনে হয়।
৫. কোন কোন ব্যক্তির
নিকট বিশেষ পাপ তার মান সম্মানের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় তার সঙ্গী সাথীদের
মাঝে। এজন্য সে চিন্তা করে যেন তার অবস্থান সে ধরে রাখে এবং এ পাপ অব্যাহত
রাখে, যেমনটি ঘটে বিভিন্ন অপরাধ ও সন্ত্রাসী গ্র“পের প্রধানদের বেলায়।
যেমনটি ঘটেছিল অশ্লীল কবি আবু নাওয়াসের বেলায়, যখন তাকে কবি আবুল
আতাহিয়া উপদেশ দেয় ও ভর্ৎসনা করে তার পাপের জন্য। সে তখন জবাবে লিখে -
হে
আতাহিয়া! তুমি কি চাও আমি ছেড়ে দেই আনন্দ ফূর্তি করা তুমি কি
চাও আমি ধর্মকর্ম করে হারিয়ে ফেলি আমার লোকদের কাছে আমার মর্যাদা। [তিন]:
যার জন্য তাওবার প্রয়োজন সে যেন তাড়াতাড়ি তাওবা করে। কারণ তাওবা করতে
দেরী করাটাই পাপ। [চার]: আল্লাহর হক যা
ছুটে গেছে তা যথাসম্ভব আদায় করা। যেমন জাকাত দেয়া যা সে পূর্বে দেয়নি।
কেননা এতে আবার দরিদ্র লোকজনের অধিকারও রয়েছে। [পাঁচ]:
পাপের স্থানকে ত্যাগ করা যদি সেখানে অবস্থান করলে আবার সে পাপে
জড়িয়ে পড়ার আশংকা থাকে। [ছয়]: যারা
পাপ কাজে সহযোগিতা করে তাদেরকে পরিত্যাগ করা (এটিও পূর্ববর্তী ১০০টি লোক
হত্যাকারীর হাদীস থেকে গ্রহণ করা হয়েছে।) মহান আল্লাহ বলেন:
“আন্তরিক বন্ধুরাই সেদিন একে অপরের শত্রুতে পরিণত হবে, মুত্তাকীরা ছাড়া।”
(সূরা আল-যুখরুফ: ৬৭)
খারাপ সাথীরা একে অপরকে
কিয়ামতের দিন অভিশাপ দিবে। এজন্য হে তাওবাকারী, আপনাকে এদের সাথে সম্পর্ক
ছিন্ন করতে ও এদের থেকে সতর্ক থাকতে হবে, যদি আপনি তাদেরকে দাওয়াত দিতে
অপারগ হন। শয়তান যেন আপনার ঘাড়ে আবার সওয়ার হবার সুযোগ না পায় এবং
আপনাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে আবার কুপথে নিয়ে না যায়। আর আপনি তো জানেন যে,
আপনি দুর্বল তাকে প্রতিরোধ করতে সক্ষম হবেন না। এ ধরণের অনেক ঘটনা রয়েছে
যে, অনেক লোকই তার পুরাতন বন্ধু বান্ধবের সাথে সম্পর্কিত হওয়ার পর আবার
পাপে জড়িয়ে পড়েছে। [সাত]: নিজের কাছে
রক্ষিত হারাম জিনিসকে নষ্ট করে ফেলা। যেমন মাদক দ্রব্য, বাদ্যযন্ত্র, যেমন
একতারা, হারমনিয়াম, অথবা ছবি, ব্লু ফ্লিম, অশ্লীল নভেল নাটক। এগুলো নষ্ট
করে ফেলতে হবে অথবা পুড়িয়ে ফেলতে হবে। তাওবাকারীকে সঠিক পথে দৃঢ়ভাবে
থাকার জন্য অবশ্যই সব জাহেলিয়াতের জিনিস থেকে মুক্ত হতে হবে। এ ধরণের অনেক
ঘটনা রয়েছে, যাতে দেখা যায়, এসব হারাম জিনিসই তাওবাকারীর পূর্বের
অবস্থানে ফিরে যাবার পিছনে প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এর দ্বারাই সে
পথভ্রষ্ট হয়েছে। আমরা আল্লাহর নিকট সঠিক পথে টিকে থাকার জন্য তাওফীক
কামনা করছি। [আট]: ভাল সঙ্গী-সাথী গ্রহণ
করতে হবে যারা তাকে দ্বীনের ব্যাপারে সহায়তা করবে এবং এরা হবে খারাপ
সঙ্গী সাথীর বিকল্প। আর চেষ্টা করতে হবে বিভিন্ন ধর্মীয় ও ইলমী আলোচনায়
বসার জন্য। নিজেকে সব সময় এমন কাজে মশগুল রাখতে হবে যাতে কল্যাণ রয়েছে,
যেন শয়তান তাকে পূর্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেবার সুযোগ না পায়। [নয়]:
নিজ শরীরের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে যাকে সে হারাম দিয়ে প্রতিপালন
করেছে। একে আল্লাহর আনুগত্যের কাজে লাগাতে হবে এবং হালাল রুজি খেতে হবে যেন
শরীরে আবার পবিত্র রক্ত-মাংস সৃষ্টি হয়। [দশ]: তাওবা
দম আটকে যাওয়া বা ফুরিয়ে যাবার (মৃত্যুর পূর্বক্ষণে শ্বাসকষ্ট শুরু
হবার) পূর্বে এবং পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হবার পূর্বে হতে হবে।
ঘড়ঘড়ার অর্থ হলো কণ্ঠনালী হতে এমন শব্দ বের হওয়া যা মৃত্যুর পূর্ব
মুহূর্তে হয়ে থাকে। এর উদ্দেশ্য হলো কিয়ামতের পূর্বেই তাওবা করতে হবে তা
ছোট কিয়ামত হোক (মৃত্যু) বা বড় কিয়ামতই হোক (পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত
হওয়া)।
কেননা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেন: “যে ব্যক্তি আল্লাহর নিকট তাওবা করবে ঘড়ঘড়া উঠার পূর্বে, আল্লাহ
তার তাওবা কবুল করবেন।” (আহমাদ, তিরমিযী, সহীহ আল জামে’ : ৬১৩২)
Source: সরলপথ
শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম
করুণাময়, অতি দয়ালু
তাওবা
শব্দটি এক মহান শব্দ। এর অর্থ খুবই গভীর। এমন নয় যা অনেকেই মনে করে
থাকেন, মুখে শব্দটি বললাম অতঃপর গুনাহে লিপ্ত থাকলাম। আপনি আল্লাহর
নিম্নোক্ত বাণী অনুধাবন করে দেখুন। আল্লাহ্ কি বলছেন: “তোমরা
তোমাদের প্রভূর নিকট ক্ষমা
প্রার্থনা কর। অতঃপর তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন (তাওবা) কর।” (সূরা হুদ: ৩)
আয়াতের
মধ্যে সকলকে ক্ষমা চাইতে বলা হয়েছে, অতঃপর তাওবা করতে বলা হয়েছে। সুতরাং
তাওবা হচ্ছে ক্ষমা প্রার্থনার পর অতিরিক্ত আলাদা বিষয়।
কোন
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের জন্য অবশ্যই কিছু শর্ত থাকে। আলেম-ওলামাগণ কুরআন ও
হাদীস মন্থন করে তাওবার জন্য কতিপয় শর্ত উল্লেখ করেছেন, তা হলো:
এক:
দ্রুত পাপ থেকে বিরত হওয়া।
দুই:
পূর্বে যা ঘটে গেছে সে জন্য অনুতপ্ত হওয়া।
তিন:
পুনরায় পাপ কাজে ফিরে না আসার জন্য দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করা।
চার:
প্রাপকদের হক ফিরিয়ে দেয়া যা অন্যায়ভাবে নেয়া হয়েছিল অথবা তাদের নিকট
থেকে মাফ চেয়ে নেওয়া। আর খালেসভাবে তাওবার জন্য কতিপয় আলেম যেসব
শর্ত উল্লেখ করেছেন, নিম্নে সেগুলো উদাহরণসহ আলোচনা করা হচ্ছে। [এক]:
শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য পাপ ত্যাগ করা, অন্য কোন কারণে নয়,
যেমন; অক্ষমতার কারণে পাপ থেকে দূরে থাকা, এসব কর্ম করতে ভাল না লাগা
অথবা লোকজন মন্দ বলবে এই ভয়ে পাপ ত্যাগ করা। এজন্য তাকে তাওবাকারী বলা
হবে না, যে ব্যক্তি পাপ ত্যাগ করেছে তার মানহানী ঘটায় বা এর জন্য হয়তো
সে চাকুরীচ্যুত বা পদবী হারাতে পারে। তাকে তাওবাকারী বলা যাবে না, যে
ব্যক্তি পাপ ত্যাগ করল তার শক্তি ও স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য। যেমন; কেউ জেনা
করা ত্যাগ করলো যেন দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে বাঁচতে পারে অথবা তার শরীর ও
স্মৃতি শক্তিকে দুর্বল না করে।
তেমনিভাবে তাকে তাওবাকারী
বলা যাবে না, যে ব্যক্তি চুরি করা ছেড়ে দিয়েছে; কোন বাড়ীতে ঢুকার পথ না
পেয়ে বা সিন্দুক খুলতে অসমর্থ কিংবা পাহারাদার ও পুলিশের ভয়ে। তাকে
তাওবাকারী বলা যাবে না, যে দূর্নীতি দমন বিভাগের লোকজনদের জোর তৎপরতায় ধরা
পড়ার ভয়ে ঘুষ খাওয়া বন্দ রেখেছে।
আর তাকেও তাওবাকারী
বলা যাবে না, যে ব্যক্তি মদ পান, মাদকদ্রব্য বা হেরোইন সেবন ইত্যাদি ছেড়ে
দিয়েছে দারিদ্রের কারণে।
তেমনিভাবে তাকেও তাওবাকারী বলা
যাবে না, যে সামর্থহীন হওয়ার কারণে গুনাহ করা ছেড়ে দিলো। যেমন মিথ্যা বলা
ছেড়ে দিয়েছে তার কথায় জড়তা সৃষ্টি হওয়ার কারণে কিংবা জেনা করছে না
যেহেতু সে সহবাস ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে, কিংবা চুরি করা ছেড়ে দিয়েছে আহত
হয়ে পঙ্গু হয়ে পড়ার কারণে। বরং এসবে অবশ্যই অনুতপ্ত হতে হবে, সব
ধরনের পাপ থেকে মুক্ত হতে হবে এবং অতীত কর্মকান্ডের জন্য লজ্জিত হয়ে
আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।
এ জন্যেই রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “অনুতপ্ত হওয়াই হলো তাওবা।”(আহমাদ,
ইবনে মাজা, সহীহ আল-জামে ৬৮০২)
মহান আল্লাহ আকাংখা
পোষণকারী অপারগকে কর্ম সম্পাদনকারীর মর্যাদায় ভূষিত করেছেন। আপনি জানেন
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি বলেছেন:
“দুনিয়া চার
প্রকার লোকের জন্য;
(১) সেই বান্দার জন্য যাকে
আল্লাহ মাল ও জ্ঞান দান করেছেন সুতরাং সে এতে তার প্রভূকে ভয় করছে, তার
আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক রাখছে এবং তার ব্যাপারে আল্লাহর হক জানছে, এ হলো
সর্বোত্তম অবস্থানে।
(২) সেই বান্দা যাকে আল্লাহ জ্ঞান
দান করেছেন কিন্তু মাল দেননি, সে হলো সঠিক নিয়তের লোক, সে বলে, যদি আমার
টাকা পয়সা থাকতো তাহলে উমুক ব্যাক্তির মত কাজ করতাম। সে তার নিয়ত
অনুযায়ী সওয়াব পাবে। এদের দুজনের নেকী সমান হবে।
(৩) আর
সেই বান্দা যাকে আল্লাহ টাকা পয়সা দিয়েছেন কিন্তু জ্ঞান দান করেননি। সে
না জেনেই তার টাকা পয়সা খরচ করছে। এতে সে আল্লাহকে ভয় করে না, আত্মীয়তা
রক্ষা করে না এবং এতে আল্লাহর হকও সে জানে না। সে হলো সর্ব নিকৃষ্ট
অবস্থানে।
(৪) আর সেই বান্দা যাকে আল্লাহ মালও দেননি
জ্ঞানও দেননি, সে বলে আমার টাকা পয়সা থাকলে উমুকের মতই (খারাপ কাজ) করতাম।
সে তার নিয়ত অনুযায়ী প্রতিদান পাবে। এরা দুজনই গুনাহর দিক থেকে সমান। (আহমদ,
তিরমিযী, সহীহুত তারগীব ওয়াত তারহীব: ১/৯) [দুই]:
পাপের কদর্যতা ও ভয়াবহতা অনুভব করা; অর্থাৎ সঠিক তাওবার সাথে
কখনো আনন্দ ও মজা পাওয়া যাবেনা অতীত পাপের কথা স্মরণ হলে অথবা কখনো
ভবিষ্যতে সেসব কাজে ফিরে যাবে, এ কামনা মনে স্থান পাবে না।
ইবনুল
কাইয়্যেম রহমতুল্লাহ আলাইহে তার লিখা [الداء والدواء] ‘রোগ ও চিকিৎসা’
এবং [الفوائد] ‘আল্ফাওয়াইদ’ নামক গ্রন্থে গুনাহের অনেক ক্ষতির কথা উল্লেখ
করেছেন। তন্মধ্যে: জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হওয়া, অন্তরে একাকিত্ব অনুভব করা,
কাজকর্ম কঠিন হয়ে যাওয়া, শরীর দুর্বল হয়ে যাওয়া, আল্লাহর আনুগত্য থেকে
বঞ্চিত হওয়া, বরকত কমে যাওয়া, কাজে সমন্বয় না হওয়া, গুনাহর কাজে
অভ্যস্থ হয়ে যাওয়া, আল্লাহর ব্যাপারে পাপীর অনাসক্তি সৃষ্টি হয় এবং
লোকজন তাকে অশ্রদ্ধা করে, জীবজন্তু তাকে অভিশাপ দেয়, সে সর্বদা অপমানিত
হতে থাকে, অন্তরে মোহর পড়ে যায়, লানতের মাঝে পড়ে এবং দু’আ কবুল হয় না,
জলে ও স্থলে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়, আত্মমর্যাদাবোধ কমে যায়, লজ্জা চলে
যায়, নিয়ামত দূর হয়ে যায়, আজাব নেমে আসে, পাপীর অন্তরে সর্বদা ভয় নেমে
আসে এবং সে শয়তানের দোসরে পরিণত হয়, তার জীবন সমাপ্ত হয় মন্দের উপর এবং
পরকালীন আজাবে নিপতিত হয়।
পাপের এই ক্ষতি ও বিপর্যয়
যদি বান্দা জানতে পারে তাহলে সে পাপ থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকবে। কিছু কিছু
লোক এক পাপ ছেড়ে আরেক পাপ করতে শুরু করে তার কিছু কারণ হলো:
১.
মনে করে যে, এর পাপ কিছুটা হালকা। ২. মন পাপের দিকে বেশী আকৃষ্ট হয়
এবং এর দিকে ঝোক খুবই প্রবল থাকে। ৩. এ পাপ করার জন্য পারিপার্শিক
অবস্থা সহজ ও সহায়ক হয় অন্যটির তুলনায়, অন্য পাপের মোকাবেলায় যার জন্য
অনেক কিছু জোগাড় করা লাগে। ৪. তার সঙ্গী সাথীরা এ পাপের সাথে জড়িত,
তাদেরকে ত্যাগ করা কঠিন বলে মনে হয়।
৫. কোন কোন ব্যক্তির
নিকট বিশেষ পাপ তার মান সম্মানের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় তার সঙ্গী সাথীদের
মাঝে। এজন্য সে চিন্তা করে যেন তার অবস্থান সে ধরে রাখে এবং এ পাপ অব্যাহত
রাখে, যেমনটি ঘটে বিভিন্ন অপরাধ ও সন্ত্রাসী গ্র“পের প্রধানদের বেলায়।
যেমনটি ঘটেছিল অশ্লীল কবি আবু নাওয়াসের বেলায়, যখন তাকে কবি আবুল
আতাহিয়া উপদেশ দেয় ও ভর্ৎসনা করে তার পাপের জন্য। সে তখন জবাবে লিখে -
হে
আতাহিয়া! তুমি কি চাও আমি ছেড়ে দেই আনন্দ ফূর্তি করা তুমি কি
চাও আমি ধর্মকর্ম করে হারিয়ে ফেলি আমার লোকদের কাছে আমার মর্যাদা। [তিন]:
যার জন্য তাওবার প্রয়োজন সে যেন তাড়াতাড়ি তাওবা করে। কারণ তাওবা করতে
দেরী করাটাই পাপ। [চার]: আল্লাহর হক যা
ছুটে গেছে তা যথাসম্ভব আদায় করা। যেমন জাকাত দেয়া যা সে পূর্বে দেয়নি।
কেননা এতে আবার দরিদ্র লোকজনের অধিকারও রয়েছে। [পাঁচ]:
পাপের স্থানকে ত্যাগ করা যদি সেখানে অবস্থান করলে আবার সে পাপে
জড়িয়ে পড়ার আশংকা থাকে। [ছয়]: যারা
পাপ কাজে সহযোগিতা করে তাদেরকে পরিত্যাগ করা (এটিও পূর্ববর্তী ১০০টি লোক
হত্যাকারীর হাদীস থেকে গ্রহণ করা হয়েছে।) মহান আল্লাহ বলেন:
“আন্তরিক বন্ধুরাই সেদিন একে অপরের শত্রুতে পরিণত হবে, মুত্তাকীরা ছাড়া।”
(সূরা আল-যুখরুফ: ৬৭)
খারাপ সাথীরা একে অপরকে
কিয়ামতের দিন অভিশাপ দিবে। এজন্য হে তাওবাকারী, আপনাকে এদের সাথে সম্পর্ক
ছিন্ন করতে ও এদের থেকে সতর্ক থাকতে হবে, যদি আপনি তাদেরকে দাওয়াত দিতে
অপারগ হন। শয়তান যেন আপনার ঘাড়ে আবার সওয়ার হবার সুযোগ না পায় এবং
আপনাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে আবার কুপথে নিয়ে না যায়। আর আপনি তো জানেন যে,
আপনি দুর্বল তাকে প্রতিরোধ করতে সক্ষম হবেন না। এ ধরণের অনেক ঘটনা রয়েছে
যে, অনেক লোকই তার পুরাতন বন্ধু বান্ধবের সাথে সম্পর্কিত হওয়ার পর আবার
পাপে জড়িয়ে পড়েছে। [সাত]: নিজের কাছে
রক্ষিত হারাম জিনিসকে নষ্ট করে ফেলা। যেমন মাদক দ্রব্য, বাদ্যযন্ত্র, যেমন
একতারা, হারমনিয়াম, অথবা ছবি, ব্লু ফ্লিম, অশ্লীল নভেল নাটক। এগুলো নষ্ট
করে ফেলতে হবে অথবা পুড়িয়ে ফেলতে হবে। তাওবাকারীকে সঠিক পথে দৃঢ়ভাবে
থাকার জন্য অবশ্যই সব জাহেলিয়াতের জিনিস থেকে মুক্ত হতে হবে। এ ধরণের অনেক
ঘটনা রয়েছে, যাতে দেখা যায়, এসব হারাম জিনিসই তাওবাকারীর পূর্বের
অবস্থানে ফিরে যাবার পিছনে প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এর দ্বারাই সে
পথভ্রষ্ট হয়েছে। আমরা আল্লাহর নিকট সঠিক পথে টিকে থাকার জন্য তাওফীক
কামনা করছি। [আট]: ভাল সঙ্গী-সাথী গ্রহণ
করতে হবে যারা তাকে দ্বীনের ব্যাপারে সহায়তা করবে এবং এরা হবে খারাপ
সঙ্গী সাথীর বিকল্প। আর চেষ্টা করতে হবে বিভিন্ন ধর্মীয় ও ইলমী আলোচনায়
বসার জন্য। নিজেকে সব সময় এমন কাজে মশগুল রাখতে হবে যাতে কল্যাণ রয়েছে,
যেন শয়তান তাকে পূর্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেবার সুযোগ না পায়। [নয়]:
নিজ শরীরের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে যাকে সে হারাম দিয়ে প্রতিপালন
করেছে। একে আল্লাহর আনুগত্যের কাজে লাগাতে হবে এবং হালাল রুজি খেতে হবে যেন
শরীরে আবার পবিত্র রক্ত-মাংস সৃষ্টি হয়। [দশ]: তাওবা
দম আটকে যাওয়া বা ফুরিয়ে যাবার (মৃত্যুর পূর্বক্ষণে শ্বাসকষ্ট শুরু
হবার) পূর্বে এবং পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হবার পূর্বে হতে হবে।
ঘড়ঘড়ার অর্থ হলো কণ্ঠনালী হতে এমন শব্দ বের হওয়া যা মৃত্যুর পূর্ব
মুহূর্তে হয়ে থাকে। এর উদ্দেশ্য হলো কিয়ামতের পূর্বেই তাওবা করতে হবে তা
ছোট কিয়ামত হোক (মৃত্যু) বা বড় কিয়ামতই হোক (পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত
হওয়া)।
কেননা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেন: “যে ব্যক্তি আল্লাহর নিকট তাওবা করবে ঘড়ঘড়া উঠার পূর্বে, আল্লাহ
তার তাওবা কবুল করবেন।” (আহমাদ, তিরমিযী, সহীহ আল জামে’ : ৬১৩২)
Source: সরলপথ
শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম
করুণাময়, অতি দয়ালু
তাওবা
শব্দটি এক মহান শব্দ। এর অর্থ খুবই গভীর। এমন নয় যা অনেকেই মনে করে
থাকেন, মুখে শব্দটি বললাম অতঃপর গুনাহে লিপ্ত থাকলাম। আপনি আল্লাহর
নিম্নোক্ত বাণী অনুধাবন করে দেখুন। আল্লাহ্ কি বলছেন: “তোমরা
তোমাদের প্রভূর নিকট ক্ষমা
প্রার্থনা কর। অতঃপর তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন (তাওবা) কর।” (সূরা হুদ: ৩)
আয়াতের
মধ্যে সকলকে ক্ষমা চাইতে বলা হয়েছে, অতঃপর তাওবা করতে বলা হয়েছে। সুতরাং
তাওবা হচ্ছে ক্ষমা প্রার্থনার পর অতিরিক্ত আলাদা বিষয়।
কোন
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের জন্য অবশ্যই কিছু শর্ত থাকে। আলেম-ওলামাগণ কুরআন ও
হাদীস মন্থন করে তাওবার জন্য কতিপয় শর্ত উল্লেখ করেছেন, তা হলো:
এক:
দ্রুত পাপ থেকে বিরত হওয়া।
দুই:
পূর্বে যা ঘটে গেছে সে জন্য অনুতপ্ত হওয়া।
তিন:
পুনরায় পাপ কাজে ফিরে না আসার জন্য দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করা।
চার:
প্রাপকদের হক ফিরিয়ে দেয়া যা অন্যায়ভাবে নেয়া হয়েছিল অথবা তাদের নিকট
থেকে মাফ চেয়ে নেওয়া। আর খালেসভাবে তাওবার জন্য কতিপয় আলেম যেসব
শর্ত উল্লেখ করেছেন, নিম্নে সেগুলো উদাহরণসহ আলোচনা করা হচ্ছে। [এক]:
শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য পাপ ত্যাগ করা, অন্য কোন কারণে নয়,
যেমন; অক্ষমতার কারণে পাপ থেকে দূরে থাকা, এসব কর্ম করতে ভাল না লাগা
অথবা লোকজন মন্দ বলবে এই ভয়ে পাপ ত্যাগ করা। এজন্য তাকে তাওবাকারী বলা
হবে না, যে ব্যক্তি পাপ ত্যাগ করেছে তার মানহানী ঘটায় বা এর জন্য হয়তো
সে চাকুরীচ্যুত বা পদবী হারাতে পারে। তাকে তাওবাকারী বলা যাবে না, যে
ব্যক্তি পাপ ত্যাগ করল তার শক্তি ও স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য। যেমন; কেউ জেনা
করা ত্যাগ করলো যেন দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে বাঁচতে পারে অথবা তার শরীর ও
স্মৃতি শক্তিকে দুর্বল না করে।
তেমনিভাবে তাকে তাওবাকারী
বলা যাবে না, যে ব্যক্তি চুরি করা ছেড়ে দিয়েছে; কোন বাড়ীতে ঢুকার পথ না
পেয়ে বা সিন্দুক খুলতে অসমর্থ কিংবা পাহারাদার ও পুলিশের ভয়ে। তাকে
তাওবাকারী বলা যাবে না, যে দূর্নীতি দমন বিভাগের লোকজনদের জোর তৎপরতায় ধরা
পড়ার ভয়ে ঘুষ খাওয়া বন্দ রেখেছে।
আর তাকেও তাওবাকারী
বলা যাবে না, যে ব্যক্তি মদ পান, মাদকদ্রব্য বা হেরোইন সেবন ইত্যাদি ছেড়ে
দিয়েছে দারিদ্রের কারণে।
তেমনিভাবে তাকেও তাওবাকারী বলা
যাবে না, যে সামর্থহীন হওয়ার কারণে গুনাহ করা ছেড়ে দিলো। যেমন মিথ্যা বলা
ছেড়ে দিয়েছে তার কথায় জড়তা সৃষ্টি হওয়ার কারণে কিংবা জেনা করছে না
যেহেতু সে সহবাস ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে, কিংবা চুরি করা ছেড়ে দিয়েছে আহত
হয়ে পঙ্গু হয়ে পড়ার কারণে। বরং এসবে অবশ্যই অনুতপ্ত হতে হবে, সব
ধরনের পাপ থেকে মুক্ত হতে হবে এবং অতীত কর্মকান্ডের জন্য লজ্জিত হয়ে
আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।
এ জন্যেই রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “অনুতপ্ত হওয়াই হলো তাওবা।”(আহমাদ,
ইবনে মাজা, সহীহ আল-জামে ৬৮০২)
মহান আল্লাহ আকাংখা
পোষণকারী অপারগকে কর্ম সম্পাদনকারীর মর্যাদায় ভূষিত করেছেন। আপনি জানেন
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি বলেছেন:
“দুনিয়া চার
প্রকার লোকের জন্য;
(১) সেই বান্দার জন্য যাকে
আল্লাহ মাল ও জ্ঞান দান করেছেন সুতরাং সে এতে তার প্রভূকে ভয় করছে, তার
আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক রাখছে এবং তার ব্যাপারে আল্লাহর হক জানছে, এ হলো
সর্বোত্তম অবস্থানে।
(২) সেই বান্দা যাকে আল্লাহ জ্ঞান
দান করেছেন কিন্তু মাল দেননি, সে হলো সঠিক নিয়তের লোক, সে বলে, যদি আমার
টাকা পয়সা থাকতো তাহলে উমুক ব্যাক্তির মত কাজ করতাম। সে তার নিয়ত
অনুযায়ী সওয়াব পাবে। এদের দুজনের নেকী সমান হবে।
(৩) আর
সেই বান্দা যাকে আল্লাহ টাকা পয়সা দিয়েছেন কিন্তু জ্ঞান দান করেননি। সে
না জেনেই তার টাকা পয়সা খরচ করছে। এতে সে আল্লাহকে ভয় করে না, আত্মীয়তা
রক্ষা করে না এবং এতে আল্লাহর হকও সে জানে না। সে হলো সর্ব নিকৃষ্ট
অবস্থানে।
(৪) আর সেই বান্দা যাকে আল্লাহ মালও দেননি
জ্ঞানও দেননি, সে বলে আমার টাকা পয়সা থাকলে উমুকের মতই (খারাপ কাজ) করতাম।
সে তার নিয়ত অনুযায়ী প্রতিদান পাবে। এরা দুজনই গুনাহর দিক থেকে সমান। (আহমদ,
তিরমিযী, সহীহুত তারগীব ওয়াত তারহীব: ১/৯) [দুই]:
পাপের কদর্যতা ও ভয়াবহতা অনুভব করা; অর্থাৎ সঠিক তাওবার সাথে
কখনো আনন্দ ও মজা পাওয়া যাবেনা অতীত পাপের কথা স্মরণ হলে অথবা কখনো
ভবিষ্যতে সেসব কাজে ফিরে যাবে, এ কামনা মনে স্থান পাবে না।
ইবনুল
কাইয়্যেম রহমতুল্লাহ আলাইহে তার লিখা [الداء والدواء] ‘রোগ ও চিকিৎসা’
এবং [الفوائد] ‘আল্ফাওয়াইদ’ নামক গ্রন্থে গুনাহের অনেক ক্ষতির কথা উল্লেখ
করেছেন। তন্মধ্যে: জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হওয়া, অন্তরে একাকিত্ব অনুভব করা,
কাজকর্ম কঠিন হয়ে যাওয়া, শরীর দুর্বল হয়ে যাওয়া, আল্লাহর আনুগত্য থেকে
বঞ্চিত হওয়া, বরকত কমে যাওয়া, কাজে সমন্বয় না হওয়া, গুনাহর কাজে
অভ্যস্থ হয়ে যাওয়া, আল্লাহর ব্যাপারে পাপীর অনাসক্তি সৃষ্টি হয় এবং
লোকজন তাকে অশ্রদ্ধা করে, জীবজন্তু তাকে অভিশাপ দেয়, সে সর্বদা অপমানিত
হতে থাকে, অন্তরে মোহর পড়ে যায়, লানতের মাঝে পড়ে এবং দু’আ কবুল হয় না,
জলে ও স্থলে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়, আত্মমর্যাদাবোধ কমে যায়, লজ্জা চলে
যায়, নিয়ামত দূর হয়ে যায়, আজাব নেমে আসে, পাপীর অন্তরে সর্বদা ভয় নেমে
আসে এবং সে শয়তানের দোসরে পরিণত হয়, তার জীবন সমাপ্ত হয় মন্দের উপর এবং
পরকালীন আজাবে নিপতিত হয়।
পাপের এই ক্ষতি ও বিপর্যয়
যদি বান্দা জানতে পারে তাহলে সে পাপ থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকবে। কিছু কিছু
লোক এক পাপ ছেড়ে আরেক পাপ করতে শুরু করে তার কিছু কারণ হলো:
১.
মনে করে যে, এর পাপ কিছুটা হালকা। ২. মন পাপের দিকে বেশী আকৃষ্ট হয়
এবং এর দিকে ঝোক খুবই প্রবল থাকে। ৩. এ পাপ করার জন্য পারিপার্শিক
অবস্থা সহজ ও সহায়ক হয় অন্যটির তুলনায়, অন্য পাপের মোকাবেলায় যার জন্য
অনেক কিছু জোগাড় করা লাগে। ৪. তার সঙ্গী সাথীরা এ পাপের সাথে জড়িত,
তাদেরকে ত্যাগ করা কঠিন বলে মনে হয়।
৫. কোন কোন ব্যক্তির
নিকট বিশেষ পাপ তার মান সম্মানের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় তার সঙ্গী সাথীদের
মাঝে। এজন্য সে চিন্তা করে যেন তার অবস্থান সে ধরে রাখে এবং এ পাপ অব্যাহত
রাখে, যেমনটি ঘটে বিভিন্ন অপরাধ ও সন্ত্রাসী গ্র“পের প্রধানদের বেলায়।
যেমনটি ঘটেছিল অশ্লীল কবি আবু নাওয়াসের বেলায়, যখন তাকে কবি আবুল
আতাহিয়া উপদেশ দেয় ও ভর্ৎসনা করে তার পাপের জন্য। সে তখন জবাবে লিখে -
হে
আতাহিয়া! তুমি কি চাও আমি ছেড়ে দেই আনন্দ ফূর্তি করা তুমি কি
চাও আমি ধর্মকর্ম করে হারিয়ে ফেলি আমার লোকদের কাছে আমার মর্যাদা। [তিন]:
যার জন্য তাওবার প্রয়োজন সে যেন তাড়াতাড়ি তাওবা করে। কারণ তাওবা করতে
দেরী করাটাই পাপ। [চার]: আল্লাহর হক যা
ছুটে গেছে তা যথাসম্ভব আদায় করা। যেমন জাকাত দেয়া যা সে পূর্বে দেয়নি।
কেননা এতে আবার দরিদ্র লোকজনের অধিকারও রয়েছে। [পাঁচ]:
পাপের স্থানকে ত্যাগ করা যদি সেখানে অবস্থান করলে আবার সে পাপে
জড়িয়ে পড়ার আশংকা থাকে। [ছয়]: যারা
পাপ কাজে সহযোগিতা করে তাদেরকে পরিত্যাগ করা (এটিও পূর্ববর্তী ১০০টি লোক
হত্যাকারীর হাদীস থেকে গ্রহণ করা হয়েছে।) মহান আল্লাহ বলেন:
“আন্তরিক বন্ধুরাই সেদিন একে অপরের শত্রুতে পরিণত হবে, মুত্তাকীরা ছাড়া।”
(সূরা আল-যুখরুফ: ৬৭)
খারাপ সাথীরা একে অপরকে
কিয়ামতের দিন অভিশাপ দিবে। এজন্য হে তাওবাকারী, আপনাকে এদের সাথে সম্পর্ক
ছিন্ন করতে ও এদের থেকে সতর্ক থাকতে হবে, যদি আপনি তাদেরকে দাওয়াত দিতে
অপারগ হন। শয়তান যেন আপনার ঘাড়ে আবার সওয়ার হবার সুযোগ না পায় এবং
আপনাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে আবার কুপথে নিয়ে না যায়। আর আপনি তো জানেন যে,
আপনি দুর্বল তাকে প্রতিরোধ করতে সক্ষম হবেন না। এ ধরণের অনেক ঘটনা রয়েছে
যে, অনেক লোকই তার পুরাতন বন্ধু বান্ধবের সাথে সম্পর্কিত হওয়ার পর আবার
পাপে জড়িয়ে পড়েছে। [সাত]: নিজের কাছে
রক্ষিত হারাম জিনিসকে নষ্ট করে ফেলা। যেমন মাদক দ্রব্য, বাদ্যযন্ত্র, যেমন
একতারা, হারমনিয়াম, অথবা ছবি, ব্লু ফ্লিম, অশ্লীল নভেল নাটক। এগুলো নষ্ট
করে ফেলতে হবে অথবা পুড়িয়ে ফেলতে হবে। তাওবাকারীকে সঠিক পথে দৃঢ়ভাবে
থাকার জন্য অবশ্যই সব জাহেলিয়াতের জিনিস থেকে মুক্ত হতে হবে। এ ধরণের অনেক
ঘটনা রয়েছে, যাতে দেখা যায়, এসব হারাম জিনিসই তাওবাকারীর পূর্বের
অবস্থানে ফিরে যাবার পিছনে প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এর দ্বারাই সে
পথভ্রষ্ট হয়েছে। আমরা আল্লাহর নিকট সঠিক পথে টিকে থাকার জন্য তাওফীক
কামনা করছি। [আট]: ভাল সঙ্গী-সাথী গ্রহণ
করতে হবে যারা তাকে দ্বীনের ব্যাপারে সহায়তা করবে এবং এরা হবে খারাপ
সঙ্গী সাথীর বিকল্প। আর চেষ্টা করতে হবে বিভিন্ন ধর্মীয় ও ইলমী আলোচনায়
বসার জন্য। নিজেকে সব সময় এমন কাজে মশগুল রাখতে হবে যাতে কল্যাণ রয়েছে,
যেন শয়তান তাকে পূর্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেবার সুযোগ না পায়। [নয়]:
নিজ শরীরের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে যাকে সে হারাম দিয়ে প্রতিপালন
করেছে। একে আল্লাহর আনুগত্যের কাজে লাগাতে হবে এবং হালাল রুজি খেতে হবে যেন
শরীরে আবার পবিত্র রক্ত-মাংস সৃষ্টি হয়। [দশ]: তাওবা
দম আটকে যাওয়া বা ফুরিয়ে যাবার (মৃত্যুর পূর্বক্ষণে শ্বাসকষ্ট শুরু
হবার) পূর্বে এবং পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হবার পূর্বে হতে হবে।
ঘড়ঘড়ার অর্থ হলো কণ্ঠনালী হতে এমন শব্দ বের হওয়া যা মৃত্যুর পূর্ব
মুহূর্তে হয়ে থাকে। এর উদ্দেশ্য হলো কিয়ামতের পূর্বেই তাওবা করতে হবে তা
ছোট কিয়ামত হোক (মৃত্যু) বা বড় কিয়ামতই হোক (পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত
হওয়া)।
কেননা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেন: “যে ব্যক্তি আল্লাহর নিকট তাওবা করবে ঘড়ঘড়া উঠার পূর্বে, আল্লাহ
তার তাওবা কবুল করবেন।” (আহমাদ, তিরমিযী, সহীহ আল জামে’ : ৬১৩২)
Source: সরলপথ
শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম
করুণাময়, অতি দয়ালু
তাওবা
শব্দটি এক মহান শব্দ। এর অর্থ খুবই গভীর। এমন নয় যা অনেকেই মনে করে
থাকেন, মুখে শব্দটি বললাম অতঃপর গুনাহে লিপ্ত থাকলাম। আপনি আল্লাহর
নিম্নোক্ত বাণী অনুধাবন করে দেখুন। আল্লাহ্ কি বলছেন: “তোমরা
তোমাদের প্রভূর নিকট ক্ষমা
প্রার্থনা কর। অতঃপর তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন (তাওবা) কর।” (সূরা হুদ: ৩)
আয়াতের
মধ্যে সকলকে ক্ষমা চাইতে বলা হয়েছে, অতঃপর তাওবা করতে বলা হয়েছে। সুতরাং
তাওবা হচ্ছে ক্ষমা প্রার্থনার পর অতিরিক্ত আলাদা বিষয়।
কোন
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের জন্য অবশ্যই কিছু শর্ত থাকে। আলেম-ওলামাগণ কুরআন ও
হাদীস মন্থন করে তাওবার জন্য কতিপয় শর্ত উল্লেখ করেছেন, তা হলো:
এক:
দ্রুত পাপ থেকে বিরত হওয়া।
দুই:
পূর্বে যা ঘটে গেছে সে জন্য অনুতপ্ত হওয়া।
তিন:
পুনরায় পাপ কাজে ফিরে না আসার জন্য দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করা।
চার:
প্রাপকদের হক ফিরিয়ে দেয়া যা অন্যায়ভাবে নেয়া হয়েছিল অথবা তাদের নিকট
থেকে মাফ চেয়ে নেওয়া। আর খালেসভাবে তাওবার জন্য কতিপয় আলেম যেসব
শর্ত উল্লেখ করেছেন, নিম্নে সেগুলো উদাহরণসহ আলোচনা করা হচ্ছে। [এক]:
শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য পাপ ত্যাগ করা, অন্য কোন কারণে নয়,
যেমন; অক্ষমতার কারণে পাপ থেকে দূরে থাকা, এসব কর্ম করতে ভাল না লাগা
অথবা লোকজন মন্দ বলবে এই ভয়ে পাপ ত্যাগ করা। এজন্য তাকে তাওবাকারী বলা
হবে না, যে ব্যক্তি পাপ ত্যাগ করেছে তার মানহানী ঘটায় বা এর জন্য হয়তো
সে চাকুরীচ্যুত বা পদবী হারাতে পারে। তাকে তাওবাকারী বলা যাবে না, যে
ব্যক্তি পাপ ত্যাগ করল তার শক্তি ও স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য। যেমন; কেউ জেনা
করা ত্যাগ করলো যেন দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে বাঁচতে পারে অথবা তার শরীর ও
স্মৃতি শক্তিকে দুর্বল না করে।
তেমনিভাবে তাকে তাওবাকারী
বলা যাবে না, যে ব্যক্তি চুরি করা ছেড়ে দিয়েছে; কোন বাড়ীতে ঢুকার পথ না
পেয়ে বা সিন্দুক খুলতে অসমর্থ কিংবা পাহারাদার ও পুলিশের ভয়ে। তাকে
তাওবাকারী বলা যাবে না, যে দূর্নীতি দমন বিভাগের লোকজনদের জোর তৎপরতায় ধরা
পড়ার ভয়ে ঘুষ খাওয়া বন্দ রেখেছে।
আর তাকেও তাওবাকারী
বলা যাবে না, যে ব্যক্তি মদ পান, মাদকদ্রব্য বা হেরোইন সেবন ইত্যাদি ছেড়ে
দিয়েছে দারিদ্রের কারণে।
তেমনিভাবে তাকেও তাওবাকারী বলা
যাবে না, যে সামর্থহীন হওয়ার কারণে গুনাহ করা ছেড়ে দিলো। যেমন মিথ্যা বলা
ছেড়ে দিয়েছে তার কথায় জড়তা সৃষ্টি হওয়ার কারণে কিংবা জেনা করছে না
যেহেতু সে সহবাস ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে, কিংবা চুরি করা ছেড়ে দিয়েছে আহত
হয়ে পঙ্গু হয়ে পড়ার কারণে। বরং এসবে অবশ্যই অনুতপ্ত হতে হবে, সব
ধরনের পাপ থেকে মুক্ত হতে হবে এবং অতীত কর্মকান্ডের জন্য লজ্জিত হয়ে
আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।
এ জন্যেই রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “অনুতপ্ত হওয়াই হলো তাওবা।”(আহমাদ,
ইবনে মাজা, সহীহ আল-জামে ৬৮০২)
মহান আল্লাহ আকাংখা
পোষণকারী অপারগকে কর্ম সম্পাদনকারীর মর্যাদায় ভূষিত করেছেন। আপনি জানেন
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি বলেছেন:
“দুনিয়া চার
প্রকার লোকের জন্য;
(১) সেই বান্দার জন্য যাকে
আল্লাহ মাল ও জ্ঞান দান করেছেন সুতরাং সে এতে তার প্রভূকে ভয় করছে, তার
আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক রাখছে এবং তার ব্যাপারে আল্লাহর হক জানছে, এ হলো
সর্বোত্তম অবস্থানে।
(২) সেই বান্দা যাকে আল্লাহ জ্ঞান
দান করেছেন কিন্তু মাল দেননি, সে হলো সঠিক নিয়তের লোক, সে বলে, যদি আমার
টাকা পয়সা থাকতো তাহলে উমুক ব্যাক্তির মত কাজ করতাম। সে তার নিয়ত
অনুযায়ী সওয়াব পাবে। এদের দুজনের নেকী সমান হবে।
(৩) আর
সেই বান্দা যাকে আল্লাহ টাকা পয়সা দিয়েছেন কিন্তু জ্ঞান দান করেননি। সে
না জেনেই তার টাকা পয়সা খরচ করছে। এতে সে আল্লাহকে ভয় করে না, আত্মীয়তা
রক্ষা করে না এবং এতে আল্লাহর হকও সে জানে না। সে হলো সর্ব নিকৃষ্ট
অবস্থানে।
(৪) আর সেই বান্দা যাকে আল্লাহ মালও দেননি
জ্ঞানও দেননি, সে বলে আমার টাকা পয়সা থাকলে উমুকের মতই (খারাপ কাজ) করতাম।
সে তার নিয়ত অনুযায়ী প্রতিদান পাবে। এরা দুজনই গুনাহর দিক থেকে সমান। (আহমদ,
তিরমিযী, সহীহুত তারগীব ওয়াত তারহীব: ১/৯) [দুই]:
পাপের কদর্যতা ও ভয়াবহতা অনুভব করা; অর্থাৎ সঠিক তাওবার সাথে
কখনো আনন্দ ও মজা পাওয়া যাবেনা অতীত পাপের কথা স্মরণ হলে অথবা কখনো
ভবিষ্যতে সেসব কাজে ফিরে যাবে, এ কামনা মনে স্থান পাবে না।
ইবনুল
কাইয়্যেম রহমতুল্লাহ আলাইহে তার লিখা [الداء والدواء] ‘রোগ ও চিকিৎসা’
এবং [الفوائد] ‘আল্ফাওয়াইদ’ নামক গ্রন্থে গুনাহের অনেক ক্ষতির কথা উল্লেখ
করেছেন। তন্মধ্যে: জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হওয়া, অন্তরে একাকিত্ব অনুভব করা,
কাজকর্ম কঠিন হয়ে যাওয়া, শরীর দুর্বল হয়ে যাওয়া, আল্লাহর আনুগত্য থেকে
বঞ্চিত হওয়া, বরকত কমে যাওয়া, কাজে সমন্বয় না হওয়া, গুনাহর কাজে
অভ্যস্থ হয়ে যাওয়া, আল্লাহর ব্যাপারে পাপীর অনাসক্তি সৃষ্টি হয় এবং
লোকজন তাকে অশ্রদ্ধা করে, জীবজন্তু তাকে অভিশাপ দেয়, সে সর্বদা অপমানিত
হতে থাকে, অন্তরে মোহর পড়ে যায়, লানতের মাঝে পড়ে এবং দু’আ কবুল হয় না,
জলে ও স্থলে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়, আত্মমর্যাদাবোধ কমে যায়, লজ্জা চলে
যায়, নিয়ামত দূর হয়ে যায়, আজাব নেমে আসে, পাপীর অন্তরে সর্বদা ভয় নেমে
আসে এবং সে শয়তানের দোসরে পরিণত হয়, তার জীবন সমাপ্ত হয় মন্দের উপর এবং
পরকালীন আজাবে নিপতিত হয়।
পাপের এই ক্ষতি ও বিপর্যয়
যদি বান্দা জানতে পারে তাহলে সে পাপ থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকবে। কিছু কিছু
লোক এক পাপ ছেড়ে আরেক পাপ করতে শুরু করে তার কিছু কারণ হলো:
১.
মনে করে যে, এর পাপ কিছুটা হালকা। ২. মন পাপের দিকে বেশী আকৃষ্ট হয়
এবং এর দিকে ঝোক খুবই প্রবল থাকে। ৩. এ পাপ করার জন্য পারিপার্শিক
অবস্থা সহজ ও সহায়ক হয় অন্যটির তুলনায়, অন্য পাপের মোকাবেলায় যার জন্য
অনেক কিছু জোগাড় করা লাগে। ৪. তার সঙ্গী সাথীরা এ পাপের সাথে জড়িত,
তাদেরকে ত্যাগ করা কঠিন বলে মনে হয়।
৫. কোন কোন ব্যক্তির
নিকট বিশেষ পাপ তার মান সম্মানের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় তার সঙ্গী সাথীদের
মাঝে। এজন্য সে চিন্তা করে যেন তার অবস্থান সে ধরে রাখে এবং এ পাপ অব্যাহত
রাখে, যেমনটি ঘটে বিভিন্ন অপরাধ ও সন্ত্রাসী গ্র“পের প্রধানদের বেলায়।
যেমনটি ঘটেছিল অশ্লীল কবি আবু নাওয়াসের বেলায়, যখন তাকে কবি আবুল
আতাহিয়া উপদেশ দেয় ও ভর্ৎসনা করে তার পাপের জন্য। সে তখন জবাবে লিখে -
হে
আতাহিয়া! তুমি কি চাও আমি ছেড়ে দেই আনন্দ ফূর্তি করা তুমি কি
চাও আমি ধর্মকর্ম করে হারিয়ে ফেলি আমার লোকদের কাছে আমার মর্যাদা। [তিন]:
যার জন্য তাওবার প্রয়োজন সে যেন তাড়াতাড়ি তাওবা করে। কারণ তাওবা করতে
দেরী করাটাই পাপ। [চার]: আল্লাহর হক যা
ছুটে গেছে তা যথাসম্ভব আদায় করা। যেমন জাকাত দেয়া যা সে পূর্বে দেয়নি।
কেননা এতে আবার দরিদ্র লোকজনের অধিকারও রয়েছে। [পাঁচ]:
পাপের স্থানকে ত্যাগ করা যদি সেখানে অবস্থান করলে আবার সে পাপে
জড়িয়ে পড়ার আশংকা থাকে। [ছয়]: যারা
পাপ কাজে সহযোগিতা করে তাদেরকে পরিত্যাগ করা (এটিও পূর্ববর্তী ১০০টি লোক
হত্যাকারীর হাদীস থেকে গ্রহণ করা হয়েছে।) মহান আল্লাহ বলেন:
“আন্তরিক বন্ধুরাই সেদিন একে অপরের শত্রুতে পরিণত হবে, মুত্তাকীরা ছাড়া।”
(সূরা আল-যুখরুফ: ৬৭)
খারাপ সাথীরা একে অপরকে
কিয়ামতের দিন অভিশাপ দিবে। এজন্য হে তাওবাকারী, আপনাকে এদের সাথে সম্পর্ক
ছিন্ন করতে ও এদের থেকে সতর্ক থাকতে হবে, যদি আপনি তাদেরকে দাওয়াত দিতে
অপারগ হন। শয়তান যেন আপনার ঘাড়ে আবার সওয়ার হবার সুযোগ না পায় এবং
আপনাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে আবার কুপথে নিয়ে না যায়। আর আপনি তো জানেন যে,
আপনি দুর্বল তাকে প্রতিরোধ করতে সক্ষম হবেন না। এ ধরণের অনেক ঘটনা রয়েছে
যে, অনেক লোকই তার পুরাতন বন্ধু বান্ধবের সাথে সম্পর্কিত হওয়ার পর আবার
পাপে জড়িয়ে পড়েছে। [সাত]: নিজের কাছে
রক্ষিত হারাম জিনিসকে নষ্ট করে ফেলা। যেমন মাদক দ্রব্য, বাদ্যযন্ত্র, যেমন
একতারা, হারমনিয়াম, অথবা ছবি, ব্লু ফ্লিম, অশ্লীল নভেল নাটক। এগুলো নষ্ট
করে ফেলতে হবে অথবা পুড়িয়ে ফেলতে হবে। তাওবাকারীকে সঠিক পথে দৃঢ়ভাবে
থাকার জন্য অবশ্যই সব জাহেলিয়াতের জিনিস থেকে মুক্ত হতে হবে। এ ধরণের অনেক
ঘটনা রয়েছে, যাতে দেখা যায়, এসব হারাম জিনিসই তাওবাকারীর পূর্বের
অবস্থানে ফিরে যাবার পিছনে প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এর দ্বারাই সে
পথভ্রষ্ট হয়েছে। আমরা আল্লাহর নিকট সঠিক পথে টিকে থাকার জন্য তাওফীক
কামনা করছি। [আট]: ভাল সঙ্গী-সাথী গ্রহণ
করতে হবে যারা তাকে দ্বীনের ব্যাপারে সহায়তা করবে এবং এরা হবে খারাপ
সঙ্গী সাথীর বিকল্প। আর চেষ্টা করতে হবে বিভিন্ন ধর্মীয় ও ইলমী আলোচনায়
বসার জন্য। নিজেকে সব সময় এমন কাজে মশগুল রাখতে হবে যাতে কল্যাণ রয়েছে,
যেন শয়তান তাকে পূর্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেবার সুযোগ না পায়। [নয়]:
নিজ শরীরের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে যাকে সে হারাম দিয়ে প্রতিপালন
করেছে। একে আল্লাহর আনুগত্যের কাজে লাগাতে হবে এবং হালাল রুজি খেতে হবে যেন
শরীরে আবার পবিত্র রক্ত-মাংস সৃষ্টি হয়। [দশ]: তাওবা
দম আটকে যাওয়া বা ফুরিয়ে যাবার (মৃত্যুর পূর্বক্ষণে শ্বাসকষ্ট শুরু
হবার) পূর্বে এবং পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হবার পূর্বে হতে হবে।
ঘড়ঘড়ার অর্থ হলো কণ্ঠনালী হতে এমন শব্দ বের হওয়া যা মৃত্যুর পূর্ব
মুহূর্তে হয়ে থাকে। এর উদ্দেশ্য হলো কিয়ামতের পূর্বেই তাওবা করতে হবে তা
ছোট কিয়ামত হোক (মৃত্যু) বা বড় কিয়ামতই হোক (পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত
হওয়া)।
কেননা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেন: “যে ব্যক্তি আল্লাহর নিকট তাওবা করবে ঘড়ঘড়া উঠার পূর্বে, আল্লাহ
তার তাওবা কবুল করবেন।” (আহমাদ, তিরমিযী, সহীহ আল জামে’ : ৬১৩২)
Source: সরলপথ
শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম
করুণাময়, অতি দয়ালু
তাওবা
শব্দটি এক মহান শব্দ। এর অর্থ খুবই গভীর। এমন নয় যা অনেকেই মনে করে
থাকেন, মুখে শব্দটি বললাম অতঃপর গুনাহে লিপ্ত থাকলাম। আপনি আল্লাহর
নিম্নোক্ত বাণী অনুধাবন করে দেখুন। আল্লাহ্ কি বলছেন: “তোমরা
তোমাদের প্রভূর নিকট ক্ষমা
প্রার্থনা কর। অতঃপর তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন (তাওবা) কর।” (সূরা হুদ: ৩)
আয়াতের
মধ্যে সকলকে ক্ষমা চাইতে বলা হয়েছে, অতঃপর তাওবা করতে বলা হয়েছে। সুতরাং
তাওবা হচ্ছে ক্ষমা প্রার্থনার পর অতিরিক্ত আলাদা বিষয়।
কোন
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের জন্য অবশ্যই কিছু শর্ত থাকে। আলেম-ওলামাগণ কুরআন ও
হাদীস মন্থন করে তাওবার জন্য কতিপয় শর্ত উল্লেখ করেছেন, তা হলো:
এক:
দ্রুত পাপ থেকে বিরত হওয়া।
দুই:
পূর্বে যা ঘটে গেছে সে জন্য অনুতপ্ত হওয়া।
তিন:
পুনরায় পাপ কাজে ফিরে না আসার জন্য দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করা।
চার:
প্রাপকদের হক ফিরিয়ে দেয়া যা অন্যায়ভাবে নেয়া হয়েছিল অথবা তাদের নিকট
থেকে মাফ চেয়ে নেওয়া। আর খালেসভাবে তাওবার জন্য কতিপয় আলেম যেসব
শর্ত উল্লেখ করেছেন, নিম্নে সেগুলো উদাহরণসহ আলোচনা করা হচ্ছে। [এক]:
শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য পাপ ত্যাগ করা, অন্য কোন কারণে নয়,
যেমন; অক্ষমতার কারণে পাপ থেকে দূরে থাকা, এসব কর্ম করতে ভাল না লাগা
অথবা লোকজন মন্দ বলবে এই ভয়ে পাপ ত্যাগ করা। এজন্য তাকে তাওবাকারী বলা
হবে না, যে ব্যক্তি পাপ ত্যাগ করেছে তার মানহানী ঘটায় বা এর জন্য হয়তো
সে চাকুরীচ্যুত বা পদবী হারাতে পারে। তাকে তাওবাকারী বলা যাবে না, যে
ব্যক্তি পাপ ত্যাগ করল তার শক্তি ও স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য। যেমন; কেউ জেনা
করা ত্যাগ করলো যেন দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে বাঁচতে পারে অথবা তার শরীর ও
স্মৃতি শক্তিকে দুর্বল না করে।
তেমনিভাবে তাকে তাওবাকারী
বলা যাবে না, যে ব্যক্তি চুরি করা ছেড়ে দিয়েছে; কোন বাড়ীতে ঢুকার পথ না
পেয়ে বা সিন্দুক খুলতে অসমর্থ কিংবা পাহারাদার ও পুলিশের ভয়ে। তাকে
তাওবাকারী বলা যাবে না, যে দূর্নীতি দমন বিভাগের লোকজনদের জোর তৎপরতায় ধরা
পড়ার ভয়ে ঘুষ খাওয়া বন্দ রেখেছে।
আর তাকেও তাওবাকারী
বলা যাবে না, যে ব্যক্তি মদ পান, মাদকদ্রব্য বা হেরোইন সেবন ইত্যাদি ছেড়ে
দিয়েছে দারিদ্রের কারণে।
তেমনিভাবে তাকেও তাওবাকারী বলা
যাবে না, যে সামর্থহীন হওয়ার কারণে গুনাহ করা ছেড়ে দিলো। যেমন মিথ্যা বলা
ছেড়ে দিয়েছে তার কথায় জড়তা সৃষ্টি হওয়ার কারণে কিংবা জেনা করছে না
যেহেতু সে সহবাস ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে, কিংবা চুরি করা ছেড়ে দিয়েছে আহত
হয়ে পঙ্গু হয়ে পড়ার কারণে। বরং এসবে অবশ্যই অনুতপ্ত হতে হবে, সব
ধরনের পাপ থেকে মুক্ত হতে হবে এবং অতীত কর্মকান্ডের জন্য লজ্জিত হয়ে
আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।
এ জন্যেই রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “অনুতপ্ত হওয়াই হলো তাওবা।”(আহমাদ,
ইবনে মাজা, সহীহ আল-জামে ৬৮০২)
মহান আল্লাহ আকাংখা
পোষণকারী অপারগকে কর্ম সম্পাদনকারীর মর্যাদায় ভূষিত করেছেন। আপনি জানেন
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি বলেছেন:
“দুনিয়া চার
প্রকার লোকের জন্য;
(১) সেই বান্দার জন্য যাকে
আল্লাহ মাল ও জ্ঞান দান করেছেন সুতরাং সে এতে তার প্রভূকে ভয় করছে, তার
আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক রাখছে এবং তার ব্যাপারে আল্লাহর হক জানছে, এ হলো
সর্বোত্তম অবস্থানে।
(২) সেই বান্দা যাকে আল্লাহ জ্ঞান
দান করেছেন কিন্তু মাল দেননি, সে হলো সঠিক নিয়তের লোক, সে বলে, যদি আমার
টাকা পয়সা থাকতো তাহলে উমুক ব্যাক্তির মত কাজ করতাম। সে তার নিয়ত
অনুযায়ী সওয়াব পাবে। এদের দুজনের নেকী সমান হবে।
(৩) আর
সেই বান্দা যাকে আল্লাহ টাকা পয়সা দিয়েছেন কিন্তু জ্ঞান দান করেননি। সে
না জেনেই তার টাকা পয়সা খরচ করছে। এতে সে আল্লাহকে ভয় করে না, আত্মীয়তা
রক্ষা করে না এবং এতে আল্লাহর হকও সে জানে না। সে হলো সর্ব নিকৃষ্ট
অবস্থানে।
(৪) আর সেই বান্দা যাকে আল্লাহ মালও দেননি
জ্ঞানও দেননি, সে বলে আমার টাকা পয়সা থাকলে উমুকের মতই (খারাপ কাজ) করতাম।
সে তার নিয়ত অনুযায়ী প্রতিদান পাবে। এরা দুজনই গুনাহর দিক থেকে সমান। (আহমদ,
তিরমিযী, সহীহুত তারগীব ওয়াত তারহীব: ১/৯) [দুই]:
পাপের কদর্যতা ও ভয়াবহতা অনুভব করা; অর্থাৎ সঠিক তাওবার সাথে
কখনো আনন্দ ও মজা পাওয়া যাবেনা অতীত পাপের কথা স্মরণ হলে অথবা কখনো
ভবিষ্যতে সেসব কাজে ফিরে যাবে, এ কামনা মনে স্থান পাবে না।
ইবনুল
কাইয়্যেম রহমতুল্লাহ আলাইহে তার লিখা [الداء والدواء] ‘রোগ ও চিকিৎসা’
এবং [الفوائد] ‘আল্ফাওয়াইদ’ নামক গ্রন্থে গুনাহের অনেক ক্ষতির কথা উল্লেখ
করেছেন। তন্মধ্যে: জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হওয়া, অন্তরে একাকিত্ব অনুভব করা,
কাজকর্ম কঠিন হয়ে যাওয়া, শরীর দুর্বল হয়ে যাওয়া, আল্লাহর আনুগত্য থেকে
বঞ্চিত হওয়া, বরকত কমে যাওয়া, কাজে সমন্বয় না হওয়া, গুনাহর কাজে
অভ্যস্থ হয়ে যাওয়া, আল্লাহর ব্যাপারে পাপীর অনাসক্তি সৃষ্টি হয় এবং
লোকজন তাকে অশ্রদ্ধা করে, জীবজন্তু তাকে অভিশাপ দেয়, সে সর্বদা অপমানিত
হতে থাকে, অন্তরে মোহর পড়ে যায়, লানতের মাঝে পড়ে এবং দু’আ কবুল হয় না,
জলে ও স্থলে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়, আত্মমর্যাদাবোধ কমে যায়, লজ্জা চলে
যায়, নিয়ামত দূর হয়ে যায়, আজাব নেমে আসে, পাপীর অন্তরে সর্বদা ভয় নেমে
আসে এবং সে শয়তানের দোসরে পরিণত হয়, তার জীবন সমাপ্ত হয় মন্দের উপর এবং
পরকালীন আজাবে নিপতিত হয়।
পাপের এই ক্ষতি ও বিপর্যয়
যদি বান্দা জানতে পারে তাহলে সে পাপ থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকবে। কিছু কিছু
লোক এক পাপ ছেড়ে আরেক পাপ করতে শুরু করে তার কিছু কারণ হলো:
১.
মনে করে যে, এর পাপ কিছুটা হালকা। ২. মন পাপের দিকে বেশী আকৃষ্ট হয়
এবং এর দিকে ঝোক খুবই প্রবল থাকে। ৩. এ পাপ করার জন্য পারিপার্শিক
অবস্থা সহজ ও সহায়ক হয় অন্যটির তুলনায়, অন্য পাপের মোকাবেলায় যার জন্য
অনেক কিছু জোগাড় করা লাগে। ৪. তার সঙ্গী সাথীরা এ পাপের সাথে জড়িত,
তাদেরকে ত্যাগ করা কঠিন বলে মনে হয়।
৫. কোন কোন ব্যক্তির
নিকট বিশেষ পাপ তার মান সম্মানের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় তার সঙ্গী সাথীদের
মাঝে। এজন্য সে চিন্তা করে যেন তার অবস্থান সে ধরে রাখে এবং এ পাপ অব্যাহত
রাখে, যেমনটি ঘটে বিভিন্ন অপরাধ ও সন্ত্রাসী গ্র“পের প্রধানদের বেলায়।
যেমনটি ঘটেছিল অশ্লীল কবি আবু নাওয়াসের বেলায়, যখন তাকে কবি আবুল
আতাহিয়া উপদেশ দেয় ও ভর্ৎসনা করে তার পাপের জন্য। সে তখন জবাবে লিখে -
হে
আতাহিয়া! তুমি কি চাও আমি ছেড়ে দেই আনন্দ ফূর্তি করা তুমি কি
চাও আমি ধর্মকর্ম করে হারিয়ে ফেলি আমার লোকদের কাছে আমার মর্যাদা। [তিন]:
যার জন্য তাওবার প্রয়োজন সে যেন তাড়াতাড়ি তাওবা করে। কারণ তাওবা করতে
দেরী করাটাই পাপ। [চার]: আল্লাহর হক যা
ছুটে গেছে তা যথাসম্ভব আদায় করা। যেমন জাকাত দেয়া যা সে পূর্বে দেয়নি।
কেননা এতে আবার দরিদ্র লোকজনের অধিকারও রয়েছে। [পাঁচ]:
পাপের স্থানকে ত্যাগ করা যদি সেখানে অবস্থান করলে আবার সে পাপে
জড়িয়ে পড়ার আশংকা থাকে। [ছয়]: যারা
পাপ কাজে সহযোগিতা করে তাদেরকে পরিত্যাগ করা (এটিও পূর্ববর্তী ১০০টি লোক
হত্যাকারীর হাদীস থেকে গ্রহণ করা হয়েছে।) মহান আল্লাহ বলেন:
“আন্তরিক বন্ধুরাই সেদিন একে অপরের শত্রুতে পরিণত হবে, মুত্তাকীরা ছাড়া।”
(সূরা আল-যুখরুফ: ৬৭)
খারাপ সাথীরা একে অপরকে
কিয়ামতের দিন অভিশাপ দিবে। এজন্য হে তাওবাকারী, আপনাকে এদের সাথে সম্পর্ক
ছিন্ন করতে ও এদের থেকে সতর্ক থাকতে হবে, যদি আপনি তাদেরকে দাওয়াত দিতে
অপারগ হন। শয়তান যেন আপনার ঘাড়ে আবার সওয়ার হবার সুযোগ না পায় এবং
আপনাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে আবার কুপথে নিয়ে না যায়। আর আপনি তো জানেন যে,
আপনি দুর্বল তাকে প্রতিরোধ করতে সক্ষম হবেন না। এ ধরণের অনেক ঘটনা রয়েছে
যে, অনেক লোকই তার পুরাতন বন্ধু বান্ধবের সাথে সম্পর্কিত হওয়ার পর আবার
পাপে জড়িয়ে পড়েছে। [সাত]: নিজের কাছে
রক্ষিত হারাম জিনিসকে নষ্ট করে ফেলা। যেমন মাদক দ্রব্য, বাদ্যযন্ত্র, যেমন
একতারা, হারমনিয়াম, অথবা ছবি, ব্লু ফ্লিম, অশ্লীল নভেল নাটক। এগুলো নষ্ট
করে ফেলতে হবে অথবা পুড়িয়ে ফেলতে হবে। তাওবাকারীকে সঠিক পথে দৃঢ়ভাবে
থাকার জন্য অবশ্যই সব জাহেলিয়াতের জিনিস থেকে মুক্ত হতে হবে। এ ধরণের অনেক
ঘটনা রয়েছে, যাতে দেখা যায়, এসব হারাম জিনিসই তাওবাকারীর পূর্বের
অবস্থানে ফিরে যাবার পিছনে প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এর দ্বারাই সে
পথভ্রষ্ট হয়েছে। আমরা আল্লাহর নিকট সঠিক পথে টিকে থাকার জন্য তাওফীক
কামনা করছি। [আট]: ভাল সঙ্গী-সাথী গ্রহণ
করতে হবে যারা তাকে দ্বীনের ব্যাপারে সহায়তা করবে এবং এরা হবে খারাপ
সঙ্গী সাথীর বিকল্প। আর চেষ্টা করতে হবে বিভিন্ন ধর্মীয় ও ইলমী আলোচনায়
বসার জন্য। নিজেকে সব সময় এমন কাজে মশগুল রাখতে হবে যাতে কল্যাণ রয়েছে,
যেন শয়তান তাকে পূর্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেবার সুযোগ না পায়। [নয়]:
নিজ শরীরের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে যাকে সে হারাম দিয়ে প্রতিপালন
করেছে। একে আল্লাহর আনুগত্যের কাজে লাগাতে হবে এবং হালাল রুজি খেতে হবে যেন
শরীরে আবার পবিত্র রক্ত-মাংস সৃষ্টি হয়। [দশ]: তাওবা
দম আটকে যাওয়া বা ফুরিয়ে যাবার (মৃত্যুর পূর্বক্ষণে শ্বাসকষ্ট শুরু
হবার) পূর্বে এবং পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হবার পূর্বে হতে হবে।
ঘড়ঘড়ার অর্থ হলো কণ্ঠনালী হতে এমন শব্দ বের হওয়া যা মৃত্যুর পূর্ব
মুহূর্তে হয়ে থাকে। এর উদ্দেশ্য হলো কিয়ামতের পূর্বেই তাওবা করতে হবে তা
ছোট কিয়ামত হোক (মৃত্যু) বা বড় কিয়ামতই হোক (পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত
হওয়া)।
কেননা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেন: “যে ব্যক্তি আল্লাহর নিকট তাওবা করবে ঘড়ঘড়া উঠার পূর্বে, আল্লাহ
তার তাওবা কবুল করবেন।” (আহমাদ, তিরমিযী, সহীহ আল জামে’ : ৬১৩২)
Source: সরলপথ
শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম
করুণাময়, অতি দয়ালু
তাওবা
শব্দটি এক মহান শব্দ। এর অর্থ খুবই গভীর। এমন নয় যা অনেকেই মনে করে
থাকেন, মুখে শব্দটি বললাম অতঃপর গুনাহে লিপ্ত থাকলাম। আপনি আল্লাহর
নিম্নোক্ত বাণী অনুধাবন করে দেখুন। আল্লাহ্ কি বলছেন: “তোমরা
তোমাদের প্রভূর নিকট ক্ষমা
প্রার্থনা কর। অতঃপর তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন (তাওবা) কর।” (সূরা হুদ: ৩)
আয়াতের
মধ্যে সকলকে ক্ষমা চাইতে বলা হয়েছে, অতঃপর তাওবা করতে বলা হয়েছে। সুতরাং
তাওবা হচ্ছে ক্ষমা প্রার্থনার পর অতিরিক্ত আলাদা বিষয়।
কোন
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের জন্য অবশ্যই কিছু শর্ত থাকে। আলেম-ওলামাগণ কুরআন ও
হাদীস মন্থন করে তাওবার জন্য কতিপয় শর্ত উল্লেখ করেছেন, তা হলো:
এক:
দ্রুত পাপ থেকে বিরত হওয়া।
দুই:
পূর্বে যা ঘটে গেছে সে জন্য অনুতপ্ত হওয়া।
তিন:
পুনরায় পাপ কাজে ফিরে না আসার জন্য দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করা।
চার:
প্রাপকদের হক ফিরিয়ে দেয়া যা অন্যায়ভাবে নেয়া হয়েছিল অথবা তাদের নিকট
থেকে মাফ চেয়ে নেওয়া। আর খালেসভাবে তাওবার জন্য কতিপয় আলেম যেসব
শর্ত উল্লেখ করেছেন, নিম্নে সেগুলো উদাহরণসহ আলোচনা করা হচ্ছে। [এক]:
শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য পাপ ত্যাগ করা, অন্য কোন কারণে নয়,
যেমন; অক্ষমতার কারণে পাপ থেকে দূরে থাকা, এসব কর্ম করতে ভাল না লাগা
অথবা লোকজন মন্দ বলবে এই ভয়ে পাপ ত্যাগ করা। এজন্য তাকে তাওবাকারী বলা
হবে না, যে ব্যক্তি পাপ ত্যাগ করেছে তার মানহানী ঘটায় বা এর জন্য হয়তো
সে চাকুরীচ্যুত বা পদবী হারাতে পারে। তাকে তাওবাকারী বলা যাবে না, যে
ব্যক্তি পাপ ত্যাগ করল তার শক্তি ও স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য। যেমন; কেউ জেনা
করা ত্যাগ করলো যেন দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে বাঁচতে পারে অথবা তার শরীর ও
স্মৃতি শক্তিকে দুর্বল না করে।
তেমনিভাবে তাকে তাওবাকারী
বলা যাবে না, যে ব্যক্তি চুরি করা ছেড়ে দিয়েছে; কোন বাড়ীতে ঢুকার পথ না
পেয়ে বা সিন্দুক খুলতে অসমর্থ কিংবা পাহারাদার ও পুলিশের ভয়ে। তাকে
তাওবাকারী বলা যাবে না, যে দূর্নীতি দমন বিভাগের লোকজনদের জোর তৎপরতায় ধরা
পড়ার ভয়ে ঘুষ খাওয়া বন্দ রেখেছে।
আর তাকেও তাওবাকারী
বলা যাবে না, যে ব্যক্তি মদ পান, মাদকদ্রব্য বা হেরোইন সেবন ইত্যাদি ছেড়ে
দিয়েছে দারিদ্রের কারণে।
তেমনিভাবে তাকেও তাওবাকারী বলা
যাবে না, যে সামর্থহীন হওয়ার কারণে গুনাহ করা ছেড়ে দিলো। যেমন মিথ্যা বলা
ছেড়ে দিয়েছে তার কথায় জড়তা সৃষ্টি হওয়ার কারণে কিংবা জেনা করছে না
যেহেতু সে সহবাস ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে, কিংবা চুরি করা ছেড়ে দিয়েছে আহত
হয়ে পঙ্গু হয়ে পড়ার কারণে। বরং এসবে অবশ্যই অনুতপ্ত হতে হবে, সব
ধরনের পাপ থেকে মুক্ত হতে হবে এবং অতীত কর্মকান্ডের জন্য লজ্জিত হয়ে
আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।
এ জন্যেই রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “অনুতপ্ত হওয়াই হলো তাওবা।”(আহমাদ,
ইবনে মাজা, সহীহ আল-জামে ৬৮০২)
মহান আল্লাহ আকাংখা
পোষণকারী অপারগকে কর্ম সম্পাদনকারীর মর্যাদায় ভূষিত করেছেন। আপনি জানেন
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি বলেছেন:
“দুনিয়া চার
প্রকার লোকের জন্য;
(১) সেই বান্দার জন্য যাকে
আল্লাহ মাল ও জ্ঞান দান করেছেন সুতরাং সে এতে তার প্রভূকে ভয় করছে, তার
আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক রাখছে এবং তার ব্যাপারে আল্লাহর হক জানছে, এ হলো
সর্বোত্তম অবস্থানে।
(২) সেই বান্দা যাকে আল্লাহ জ্ঞান
দান করেছেন কিন্তু মাল দেননি, সে হলো সঠিক নিয়তের লোক, সে বলে, যদি আমার
টাকা পয়সা থাকতো তাহলে উমুক ব্যাক্তির মত কাজ করতাম। সে তার নিয়ত
অনুযায়ী সওয়াব পাবে। এদের দুজনের নেকী সমান হবে।
(৩) আর
সেই বান্দা যাকে আল্লাহ টাকা পয়সা দিয়েছেন কিন্তু জ্ঞান দান করেননি। সে
না জেনেই তার টাকা পয়সা খরচ করছে। এতে সে আল্লাহকে ভয় করে না, আত্মীয়তা
রক্ষা করে না এবং এতে আল্লাহর হকও সে জানে না। সে হলো সর্ব নিকৃষ্ট
অবস্থানে।
(৪) আর সেই বান্দা যাকে আল্লাহ মালও দেননি
জ্ঞানও দেননি, সে বলে আমার টাকা পয়সা থাকলে উমুকের মতই (খারাপ কাজ) করতাম।
সে তার নিয়ত অনুযায়ী প্রতিদান পাবে। এরা দুজনই গুনাহর দিক থেকে সমান। (আহমদ,
তিরমিযী, সহীহুত তারগীব ওয়াত তারহীব: ১/৯) [দুই]:
পাপের কদর্যতা ও ভয়াবহতা অনুভব করা; অর্থাৎ সঠিক তাওবার সাথে
কখনো আনন্দ ও মজা পাওয়া যাবেনা অতীত পাপের কথা স্মরণ হলে অথবা কখনো
ভবিষ্যতে সেসব কাজে ফিরে যাবে, এ কামনা মনে স্থান পাবে না।
ইবনুল
কাইয়্যেম রহমতুল্লাহ আলাইহে তার লিখা [الداء والدواء] ‘রোগ ও চিকিৎসা’
এবং [الفوائد] ‘আল্ফাওয়াইদ’ নামক গ্রন্থে গুনাহের অনেক ক্ষতির কথা উল্লেখ
করেছেন। তন্মধ্যে: জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হওয়া, অন্তরে একাকিত্ব অনুভব করা,
কাজকর্ম কঠিন হয়ে যাওয়া, শরীর দুর্বল হয়ে যাওয়া, আল্লাহর আনুগত্য থেকে
বঞ্চিত হওয়া, বরকত কমে যাওয়া, কাজে সমন্বয় না হওয়া, গুনাহর কাজে
অভ্যস্থ হয়ে যাওয়া, আল্লাহর ব্যাপারে পাপীর অনাসক্তি সৃষ্টি হয় এবং
লোকজন তাকে অশ্রদ্ধা করে, জীবজন্তু তাকে অভিশাপ দেয়, সে সর্বদা অপমানিত
হতে থাকে, অন্তরে মোহর পড়ে যায়, লানতের মাঝে পড়ে এবং দু’আ কবুল হয় না,
জলে ও স্থলে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়, আত্মমর্যাদাবোধ কমে যায়, লজ্জা চলে
যায়, নিয়ামত দূর হয়ে যায়, আজাব নেমে আসে, পাপীর অন্তরে সর্বদা ভয় নেমে
আসে এবং সে শয়তানের দোসরে পরিণত হয়, তার জীবন সমাপ্ত হয় মন্দের উপর এবং
পরকালীন আজাবে নিপতিত হয়।
পাপের এই ক্ষতি ও বিপর্যয়
যদি বান্দা জানতে পারে তাহলে সে পাপ থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকবে। কিছু কিছু
লোক এক পাপ ছেড়ে আরেক পাপ করতে শুরু করে তার কিছু কারণ হলো:
১.
মনে করে যে, এর পাপ কিছুটা হালকা। ২. মন পাপের দিকে বেশী আকৃষ্ট হয়
এবং এর দিকে ঝোক খুবই প্রবল থাকে। ৩. এ পাপ করার জন্য পারিপার্শিক
অবস্থা সহজ ও সহায়ক হয় অন্যটির তুলনায়, অন্য পাপের মোকাবেলায় যার জন্য
অনেক কিছু জোগাড় করা লাগে। ৪. তার সঙ্গী সাথীরা এ পাপের সাথে জড়িত,
তাদেরকে ত্যাগ করা কঠিন বলে মনে হয়।
৫. কোন কোন ব্যক্তির
নিকট বিশেষ পাপ তার মান সম্মানের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় তার সঙ্গী সাথীদের
মাঝে। এজন্য সে চিন্তা করে যেন তার অবস্থান সে ধরে রাখে এবং এ পাপ অব্যাহত
রাখে, যেমনটি ঘটে বিভিন্ন অপরাধ ও সন্ত্রাসী গ্র“পের প্রধানদের বেলায়।
যেমনটি ঘটেছিল অশ্লীল কবি আবু নাওয়াসের বেলায়, যখন তাকে কবি আবুল
আতাহিয়া উপদেশ দেয় ও ভর্ৎসনা করে তার পাপের জন্য। সে তখন জবাবে লিখে -
হে
আতাহিয়া! তুমি কি চাও আমি ছেড়ে দেই আনন্দ ফূর্তি করা তুমি কি
চাও আমি ধর্মকর্ম করে হারিয়ে ফেলি আমার লোকদের কাছে আমার মর্যাদা। [তিন]:
যার জন্য তাওবার প্রয়োজন সে যেন তাড়াতাড়ি তাওবা করে। কারণ তাওবা করতে
দেরী করাটাই পাপ। [চার]: আল্লাহর হক যা
ছুটে গেছে তা যথাসম্ভব আদায় করা। যেমন জাকাত দেয়া যা সে পূর্বে দেয়নি।
কেননা এতে আবার দরিদ্র লোকজনের অধিকারও রয়েছে। [পাঁচ]:
পাপের স্থানকে ত্যাগ করা যদি সেখানে অবস্থান করলে আবার সে পাপে
জড়িয়ে পড়ার আশংকা থাকে। [ছয়]: যারা
পাপ কাজে সহযোগিতা করে তাদেরকে পরিত্যাগ করা (এটিও পূর্ববর্তী ১০০টি লোক
হত্যাকারীর হাদীস থেকে গ্রহণ করা হয়েছে।) মহান আল্লাহ বলেন:
“আন্তরিক বন্ধুরাই সেদিন একে অপরের শত্রুতে পরিণত হবে, মুত্তাকীরা ছাড়া।”
(সূরা আল-যুখরুফ: ৬৭)
খারাপ সাথীরা একে অপরকে
কিয়ামতের দিন অভিশাপ দিবে। এজন্য হে তাওবাকারী, আপনাকে এদের সাথে সম্পর্ক
ছিন্ন করতে ও এদের থেকে সতর্ক থাকতে হবে, যদি আপনি তাদেরকে দাওয়াত দিতে
অপারগ হন। শয়তান যেন আপনার ঘাড়ে আবার সওয়ার হবার সুযোগ না পায় এবং
আপনাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে আবার কুপথে নিয়ে না যায়। আর আপনি তো জানেন যে,
আপনি দুর্বল তাকে প্রতিরোধ করতে সক্ষম হবেন না। এ ধরণের অনেক ঘটনা রয়েছে
যে, অনেক লোকই তার পুরাতন বন্ধু বান্ধবের সাথে সম্পর্কিত হওয়ার পর আবার
পাপে জড়িয়ে পড়েছে। [সাত]: নিজের কাছে
রক্ষিত হারাম জিনিসকে নষ্ট করে ফেলা। যেমন মাদক দ্রব্য, বাদ্যযন্ত্র, যেমন
একতারা, হারমনিয়াম, অথবা ছবি, ব্লু ফ্লিম, অশ্লীল নভেল নাটক। এগুলো নষ্ট
করে ফেলতে হবে অথবা পুড়িয়ে ফেলতে হবে। তাওবাকারীকে সঠিক পথে দৃঢ়ভাবে
থাকার জন্য অবশ্যই সব জাহেলিয়াতের জিনিস থেকে মুক্ত হতে হবে। এ ধরণের অনেক
ঘটনা রয়েছে, যাতে দেখা যায়, এসব হারাম জিনিসই তাওবাকারীর পূর্বের
অবস্থানে ফিরে যাবার পিছনে প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এর দ্বারাই সে
পথভ্রষ্ট হয়েছে। আমরা আল্লাহর নিকট সঠিক পথে টিকে থাকার জন্য তাওফীক
কামনা করছি। [আট]: ভাল সঙ্গী-সাথী গ্রহণ
করতে হবে যারা তাকে দ্বীনের ব্যাপারে সহায়তা করবে এবং এরা হবে খারাপ
সঙ্গী সাথীর বিকল্প। আর চেষ্টা করতে হবে বিভিন্ন ধর্মীয় ও ইলমী আলোচনায়
বসার জন্য। নিজেকে সব সময় এমন কাজে মশগুল রাখতে হবে যাতে কল্যাণ রয়েছে,
যেন শয়তান তাকে পূর্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেবার সুযোগ না পায়। [নয়]:
নিজ শরীরের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে যাকে সে হারাম দিয়ে প্রতিপালন
করেছে। একে আল্লাহর আনুগত্যের কাজে লাগাতে হবে এবং হালাল রুজি খেতে হবে যেন
শরীরে আবার পবিত্র রক্ত-মাংস সৃষ্টি হয়। [দশ]: তাওবা
দম আটকে যাওয়া বা ফুরিয়ে যাবার (মৃত্যুর পূর্বক্ষণে শ্বাসকষ্ট শুরু
হবার) পূর্বে এবং পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হবার পূর্বে হতে হবে।
ঘড়ঘড়ার অর্থ হলো কণ্ঠনালী হতে এমন শব্দ বের হওয়া যা মৃত্যুর পূর্ব
মুহূর্তে হয়ে থাকে। এর উদ্দেশ্য হলো কিয়ামতের পূর্বেই তাওবা করতে হবে তা
ছোট কিয়ামত হোক (মৃত্যু) বা বড় কিয়ামতই হোক (পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত
হওয়া)।
কেননা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেন: “যে ব্যক্তি আল্লাহর নিকট তাওবা করবে ঘড়ঘড়া উঠার পূর্বে, আল্লাহ
তার তাওবা কবুল করবেন।” (আহমাদ, তিরমিযী, সহীহ আল জামে’ : ৬১৩২)
Source: সরলপথ